মাটিতে পা রাখলে আমরা সাধারণত কেবল ধুলো আর কাদার কথাই চিন্তা করি। কিন্তু পৃথিবীর এই উপরিভাগটি আসলে কোটি কোটি বছরের পুরনো প্রাণের এক বিশাল এবং জীবন্ত সংগ্রহশালা। গভীর অরণ্যে যখন গাছের পাতা ঝরে পড়ে, তখন মাটির ভেতরের অণুজীবরা শত শত বছর ধরে সেই মৃত পাতা ও জৈব পদার্থগুলোকে ভেঙে এক অতি সূক্ষ্ম ও গাঢ় নির্যাসে পরিণত করে।
প্রকৃতির এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফসল হলো হিউমিক এবং ফুলভিক এসিড। এটি মূলত মাটির আদিম প্রাণশক্তি, যা প্রাচীন যুগের উদ্ভিদ ও অণুজীবের জমাট বাঁধা খনিজ উপাদানের এক অপূর্ব ভাণ্ডার।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মাটির নিচের এই প্রাচীন নির্যাস মানুষের শরীরে কীভাবে প্রবেশ করে? আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন রাসায়নিকমুক্ত উর্বর মাটিতে ফলানো গাজর, মুলা বা অন্য যেকোনো মূল জাতীয় সবজি খেতেন, তখন সেই সবজির গায়ে লেগে থাকা মাটির সূক্ষ্ম কণার মাধ্যমেই এই জৈব এসিডগুলো তাদের শরীরে প্রবেশ করত। এছাড়া পাহাড়ি ঝরনা বা গভীর নলকূপের পানি যখন খনিজ সমৃদ্ধ মাটির স্তর ভেদ করে উঠে আসত, তখন প্রাকৃতিকভাবেই তাতে হিউমিক এবং ফুলভিক এসিড মিশে থাকত। প্রকৃতির আরেক আশীর্বাদ হলো শিলাজিৎ, যা হিমালয়ের মতো উঁচু পাহাড়ের ফাটল থেকে চুইয়ে পড়া এক ধরনের আঠালো নির্যাস।
হাজার হাজার বছর ধরে পাহাড়ি চাপে উদ্ভিদের জীবাশ্ম থেকে তৈরি হওয়া এই শিলাজিৎ হলো ফুলভিক এবং হিউমিক এসিডের অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উৎসগুলোর একটি। কিন্তু আধুনিক শহুরে জীবনে আমরা মাটির সেই আদিম সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের কৃষি জমিগুলো আজ এই মূল্যবান নির্যাস শূন্য হয়ে পড়েছে। আমরা ফিল্টার করা পানি এবং মাটিমুক্ত অত্যন্ত পরিষ্কার সবজি খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই চমৎকার জৈবিক উপাদানগুলো থেকে আমরা প্রায় পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছি।
এই প্রাকৃতিক নির্যাসের অভাব আমাদের শরীরে কত বড় প্রভাব ফেলছে তা ভাবলে অবাক হতে হয়। আমরা প্রতিনিয়ত বাতাস, পানি এবং খাদ্যের মাধ্যমে নানা ধরনের দূষণ ও ভারী ধাতু শরীরে গ্রহণ করছি। সিসা, পারদ বা ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং দীর্ঘমেয়াদি কোষীয় ক্লান্তির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই বর্জ্যগুলো অপসারণে মাটির এই প্রাচীন নির্যাস একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করার সম্ভাবনা রাখে। ফুলভিক এসিডের আণবিক গঠন অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায়, এটি কোষের মেমব্রেন ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে। কোষে প্রবেশ করার পর এটি অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ করতে পারে।
এটি কোষের ভেতরে থাকা ভারী ধাতু ও দূষিত পদার্থগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে একটি জটিল অণু তৈরি করে, যা শরীরের স্বাভাবিক রেচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘাম বা মলমূত্রের সাথে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। শরীরবিদ্যার ভাষায় ভারী ধাতুর সাথে যুক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়াটিকে চিলেশন বলা হয়, আর ফুলভিক এসিড প্রাকৃতিকভাবে এই কাজে সহায়তা করার ক্ষমতা রাখে।
একই সাথে এটি নিজের সাথে বয়ে আনা অতি প্রয়োজনীয় ট্রেস মিনারেল বা খনিজ উপাদানগুলো কোষের ভেতর পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ, এটি বর্জ্য অপসারণে সাহায্য করার পাশাপাশি কোষে পুষ্টির জোগান দিতেও ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে হিউমিক এসিড আকারে কিছুটা বড় হওয়ায় এটি সাধারণত সরাসরি কোষে প্রবেশ না করে আমাদের পরিপাকতন্ত্র বা অন্ত্রে অবস্থান করে। সেখানে এটি একটি শক্তিশালী শোষক বা অ্যাবজরবেন্ট হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন খাবার খাই, তখন খাবারের সাথে আসা কিছু দূষণকে রক্তে মেশার আগেই হিউমিক এসিড নিজের সাথে আটকে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
একইসাথে এটি অন্ত্রের ভেতরের পরিবেশকে এমনভাবে সাজাতে সাহায্য করে, যাতে উপকারী অণুজীবরা সেখানে নিরাপদে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। আধুনিক যুগে যেহেতু সাধারণ খাবার বা পানির মাধ্যমে এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া কঠিন, তাই অনেকেই এখন উচ্চমানের শিলাজিৎ বা প্রাকৃতিকভাবে নিষ্কাশিত ফুলভিক মিনারেল সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করে থাকেন। সুস্থ ও বর্জ্যমুক্ত শরীর পেতে হলে কেবল কৃত্রিম উপাদানের ওপর নির্ভর না করে, প্রকৃতির এই প্রাচীন শক্তিকে কাজে লাগানো একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা এই প্রাচীন নির্যাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবল বেঁচে থাকার নয়, বরং আত্মিক এবং কোষীয়।
সূত্র: Probal Kumar Mondal এর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহীত
- মতামত লেখকের নিজস্ব






