সমুদ্রে বছরের পর বছর ভেসে বেড়ানো প্লাস্টিক একসময় ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এসব কণা জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে, ছড়িয়ে পড়ে খাদ্যশৃঙ্খলে। শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারেও পৌঁছাতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই দূষণ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের তৈরি একটি বিশেষ উপাদান সমুদ্রের জলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে যেতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিকেনের বিজ্ঞানীরা রসায়নবিদ তাকুজো আইদার নেতৃত্বে এই উপাদান তৈরি করেছেন। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ।
কী বিশেষত্ব নতুন এই উপাদানের?
গবেষকদের দাবি, প্রচলিত প্লাস্টিকের মতো শক্তপোক্ত ও ব্যবহারযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি নতুন উপাদানটি সমুদ্রের জলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে যেতে পারে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, উপযুক্ত পরিবেশে ভেঙে যাওয়ার সময় এটি প্রচলিত প্লাস্টিকের মতো স্থায়ী মাইক্রোপ্লাস্টিকের অবশিষ্টাংশ তৈরি করে না।
শুধু সমুদ্রের জলেই নয়, মাটির মধ্যেও উপাদানটি ভেঙে যেতে পারে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, মাটিতে পুঁতে রাখলে এটি প্রায় ১০ দিনের মধ্যে ভেঙে যায়। এ সময় নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো উপাদান মুক্ত হয়, যা উদ্ভিদের পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্লাস্টিক দূষণ কমাতে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্লাস্টিকের দীর্ঘস্থায়িত্ব পরিবেশদূষণের অন্যতম বড় কারণ। ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক নদী-নালা পেরিয়ে সমুদ্রে জমা হয়। সময়ের সঙ্গে সূর্যালোক, ঢেউ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রভাবে এসব প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এসব কণা জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য অথচ পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী দূষণ সৃষ্টি না করে ভেঙে যায়, এমন উপাদান প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব পণ্যের ব্যবহার শেষে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের উপাদানের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নতুন উপাদানটির গবেষণাগারভিত্তিক সাফল্যকে এখনই প্রচলিত প্লাস্টিকের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন, উৎপাদন খরচ, ব্যবহারকালীন স্থায়িত্ব এবং বাস্তব পরিবেশে এর ভাঙনপ্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা আরও পরীক্ষা করে দেখতে হবে। একই সঙ্গে উপাদানটি বিভিন্ন পরিবেশে কীভাবে আচরণ করে, তা যাচাই করাও জরুরি।
প্লাস্টিক দূষণ কমাতে শুধু নতুন উপাদান উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়; প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহার বাড়ানো এবং বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্পের উন্নয়ন দূষণ মোকাবিলায় নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার তাই প্লাস্টিক দূষণমুক্ত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা জাগালেও, বাস্তবে এর কার্যকারিতা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।






