অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের জনপ্রিয় সৈকতগুলোর অগভীর পানিতে একসঙ্গে সাঁতার কাটতে দেখা গেছে ডজন ডজন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ক্যালপড হ্যামারহেড হাঙর। উপকূলের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ড্রোন ওড়ানোর সময় গবেষকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে হাঙরগুলোর এই বিরল সমাবেশ। কোনো কোনো সৈকতে একসঙ্গে প্রায় ১০০টি হাঙরের উপস্থিতিও শনাক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্টের বার্লি বিচে প্রায় ৮০টি হ্যামারহেড হাঙরের একটি দল দেখা যায়। অন্যদিকে, সানশাইন কোস্টের নুসা মেইন বিচে সবচেয়ে বড় দলে আনুমানিক ১০০টি হাঙর শনাক্ত করা হয়।
কুইন্সল্যান্ডের ‘শার্কস্মার্ট’ কর্মসূচির আওতায় ধারণ করা ড্রোনের ভিডিও বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্ট ও কুইন্সল্যান্ডের প্রাথমিক শিল্প বিভাগের গবেষক ম্যাডিসন ক্রস।
পাঁচ বছরে ২০ হাজারের বেশি ড্রোন উড্ডয়নের তথ্য বিশ্লেষণ
গবেষক দলটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুইন্সল্যান্ডের নয়টি সৈকতে পরিচালিত ২০ হাজার ৯১১টি ড্রোন উড্ডয়নের তথ্য বিশ্লেষণ করে। এতে ৮৪টি পৃথক ঘটনায় হাঙরের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৬৯৬টি হাঙর দেখার তথ্য পাওয়া যায়। তবে একই হাঙর একাধিকবার ক্যামেরায় ধরা পড়ে থাকতে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাঙরের বড় দলগুলোর উপস্থিতি বেশি ছিল অস্ট্রেলিয়ার শরৎ ও শীতের শুরুর দিকে, এপ্রিল থেকে জুন মাসে। হাঙরগুলোর গড় দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১ দশমিক ০৯ মিটার বা ৩ দশমিক ৬ ফুট। তাদের বয়স আনুমানিক এক থেকে দুই বছর।
গবেষকেরা আরও লক্ষ করেছেন, উত্তর স্ট্র্যাডব্রোক দ্বীপের কাছে থাকা বড় হাঙরগুলো সাধারণত সরল পথে চলাচল করত। বিপরীতে, বার্লি ও নুসা সৈকতের অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঙরগুলো তুলনামূলক ছোট একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করত।
উপকূলের কাছেই কেন জড়ো হয় হাঙরগুলো?
বিশ্বজুড়ে চরম হুমকির মুখে থাকা এই প্রজাতির হাঙরগুলো কেন উপকূলের এত কাছে দল বেঁধে থাকে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকদের ধারণা, এসব উপকূলীয় এলাকা ছোট হাঙরগুলোর খাদ্য সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কাছাকাছি থাকা প্রবালপ্রাচীর ও পাথুরে অঞ্চল থেকে তারা শিকার খুঁজে পেতে পারে। আবার দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটলে বড় শিকারি প্রাণীর আক্রমণ এড়ানোর সুবিধাও হতে পারে।
হাঙর রক্ষার কর্মসূচিই কি তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে?
কুইন্সল্যান্ডের হাঙর-নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বার্লি বিচে হাঙর ধরার জাল এবং নুসা বিচে ড্রামলাইন ব্যবহার করা হয়। উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই ব্যবস্থায় হাঙরের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় ৬৭৫টি স্ক্যালপড হ্যামারহেড হাঙর ধরা পড়ে। এর মধ্যে ৬৬৫টি মারা যায়।
গবেষণায় হাঙরের উপস্থিতি ও জালে আটকে পড়ার সময়ের মধ্যে একটি পার্থক্যও দেখা গেছে। ড্রোনের তথ্যে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত হাঙর বেশি দেখা গেলেও, মাছ ধরার জালে তারা বেশি ধরা পড়ে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঙরগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়স্থল ছেড়ে উন্মুক্ত সমুদ্রের দিকে যাওয়ার সময় এসব জালে আটকে পড়তে পারে।
বিরক্ত না করার পরামর্শ বিজ্ঞানীদের
গবেষকেরা দেখেছেন, স্নরকেলিং করা ব্যক্তি বা প্যাডেলবোর্ড নিয়ে চলাচলকারীরা কাছে এলে হাঙরের দলগুলো সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তাই এসব হাঙরকে বিরক্ত না করা এবং তাদের কাছাকাছি গেলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
পাশাপাশি, হাঙরগুলোর চলাচল ও আবাসস্থল ব্যবহারের ধরন আরও ভালোভাবে বুঝতে অ্যাকোস্টিক ট্যাগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকেরা। এতে ছোট হাঙরগুলো কখন, কীভাবে এবং কোন পথে উপকূলীয় আশ্রয়স্থল ছেড়ে গভীর সমুদ্রে যায়, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।






