শেষ ইচ্ছা ছিল বীজ বাঁচানো, ৬০ প্রজাতির ধানে বেঁচে থাকবেন রামেট্টন

কেরলের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামন নিজের জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণে। অর্থনৈতিক কষ্ট, ব্যক্তিগত ত্যাগ কিংবা আধুনিক কৃষির পরিবর্তন, কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি। ৭৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হলেও রেখে গেছেন ৬০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী ধানের প্রজাতির বীজ এবং প্রকৃতি ও কৃষির প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

মৃত্যুর আগে তাঁর একটি ইচ্ছা ছিল, কেউ যেন তাঁকে নায়ক না বলেন। বরং তাঁর সংরক্ষণ করা বীজগুলো যেন বেঁচে থাকে, সেটি নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কেরলের ওয়েনাড়ের মানুষের কাছে চেরুভায়াল রামন পরিচিত ছিলেন ‘রামেট্টন’ নামে। একটি সাধারণ মাটির বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। কিন্তু সেই বাড়িতে যত্ন করে সংরক্ষণ করা বীজের মূল্য ছিল অসাধারণ। সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কয়েক প্রজন্মের কৃষিজ্ঞান, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

একসময় ওয়েনাড় অঞ্চলে প্রায় ১৬০ ধরনের দেশীয় ধানের চাষ হতো। সময়ের পরিবর্তনে এবং আধুনিক কৃষিপদ্ধতির প্রসারে এসব প্রজাতির অনেকগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। যখন অধিকাংশ মানুষ পুরোনো ধানের বীজের পরিবর্তে নতুন জাতের দিকে ঝুঁকছিলেন, তখন রামেট্টন নীরবে কাজ করে যাচ্ছিলেন হারিয়ে যেতে বসা সেই ঐতিহ্য রক্ষায়।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে কাকার মৃত্যুর পর পরিবারের ঐতিহ্যবাহী বীজ সংরক্ষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে আসে। সেই দায়িত্বকে তিনি কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখেননি; বরং জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করে নিয়েছিলেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির ধান চাষ করেছেন, বীজ সংগ্রহ করেছেন এবং পরবর্তী মৌসুমের জন্য সেগুলো যত্নসহকারে সংরক্ষণ করেছেন।

প্রতিটি প্রজাতির জন্য ছিল আলাদা পরিচর্যা। জমির ছোট ছোট অংশে পৃথকভাবে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করতেন তিনি। ফসল তোলার পর বীজ শুকিয়ে রেখে দিতেন পরবর্তী বছরের জন্য, যাতে কোনো প্রজাতি হারিয়ে না যায়।

১৯৭৮ সালে তিনি রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর জমিতে আবার কেঁচোর দেখা মিলতে শুরু করে। মাটির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ঐতিহ্যবাহী ধানের চাষ ধরে রাখার প্রচেষ্টায় তিনি নিজের মতো করে এগিয়ে গেছেন।

তবে এই কাজের মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। বীজ সংরক্ষণ ও চাষাবাদে বছরে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হতো বলে জানা যায়। এমন সময়ও এসেছে, যখন নিজের পরিবারের খাবারের জন্য তাঁকে রেশনের চালের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ব্যক্তিগত আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বীজগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা।

কেন এই বীজ সংরক্ষণে এতটা নিবেদিত ছিলেন রামেট্টন?

কারণ, তাঁর কাছে বীজ ছিল কেবল ফসল উৎপাদনের উপকরণ নয়। প্রতিটি বীজের সঙ্গে যুক্ত ছিল পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় কৃষিব্যবস্থার ইতিহাস এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া জ্ঞান। দেশীয় ধানের এসব প্রজাতি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ কৃষির জন্যও একটি সম্ভাবনার পথ খোলা রাখতে চেয়েছেন।

অন্য কৃষকেরা, বিশেষ করে আদিবাসী পরিবারগুলো, তাঁর কাছে বীজ চাইতে এলে তিনি বিনামূল্যে তা দিয়ে দিতেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে শুধু বীজের বিস্তার ঘটেনি, ঐতিহ্যবাহী ধানের চাষ ধরে রাখার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তাঁর কাছে বীজের মূল্য বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। কারণ, একবার কোনো প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে দীর্ঘদিনের কৃষিজ্ঞান ও স্থানীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রামেট্টনের কাজ একসময় জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পায়। ২০২৩ সালে তিনি ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী লাভ করেন। কেরল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে ‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ হিসেবে সম্মানিত করে।

তবে এসব স্বীকৃতি তাঁর কাজের মূল উদ্দেশ্যকে বদলে দিতে পারেনি। ব্যক্তিগত খ্যাতি কিংবা সম্মাননার চেয়ে তাঁর কাছে বড় ছিল সংরক্ষিত বীজের ভবিষ্যৎ। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরও যেন এসব বীজ চাষ করা হয়, নতুন প্রজন্ম সেগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয় এবং হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ধানের জাতগুলো টিকে থাকে।

আজ রামেট্টন আর নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া বীজগুলো সংরক্ষিত থাকলে সেখান থেকে নতুন ফসল জন্মানোর সুযোগ থাকবে। প্রতিটি নতুন চারা হয়ে উঠতে পারে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, বিশ্বাস ও স্বপ্নের ধারক।

একজন মানুষ নিজের জীবনের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে এমন একটি সম্পদ রক্ষা করে গেছেন, যার সুফল পেতে পারেন ভবিষ্যতের অসংখ্য মানুষ। তাঁদের অনেকের সঙ্গে তাঁর কখনো পরিচয়ও হবে না। তবু তাঁদের জন্যই তিনি রেখে গেছেন এই অমূল্য উত্তরাধিকার।

আমরা সাধারণত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পত্তি, অর্থ কিংবা স্মৃতি রেখে যাওয়ার কথা ভাবি। কিন্তু রামেট্টনের জীবন দেখিয়ে দেয়, উত্তরাধিকার হতে পারে আরও গভীর কিছু, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, কৃষিজ্ঞান ও মানুষের অস্তিত্বের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।

তাঁর মৃত্যু তাই শুধু একজন কৃষকের বিদায় নয়; এটি ঐতিহ্যবাহী বীজ সংরক্ষণের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করারও একটি মুহূর্ত।

রামেট্টন চেয়েছিলেন, তাঁকে নায়ক বলা না হোক। তাঁর শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানানোর সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হবে তাঁর সংরক্ষিত বীজগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সেই বীজের সঙ্গে যুক্ত জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তিনি চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া বীজ আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি? এমন কিছু, যা শুধু আমাদের স্মরণ করাবে, নাকি এমন কিছু, যা আমাদের অনুপস্থিতিতেও পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করবে?

রামেট্টনের উত্তর ছিল তাঁর কাজের মধ্যেই। তিনি ধানের বীজ বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, আর সেই সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন মানুষের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক কৃষি ঐতিহ্য।

আরও পড়ুন

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes

নাব্যতা সংকটে তিস্তায় মাছের সংকট, পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

একসময় ভোর হলেই নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামতেন জেলেরা। জাল ফেললেই ধরা পড়ত টেংরা, বোয়াল, পাবদা, শিং, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। সেই মাছ বিক্রির...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

কৃষিবিজ্ঞানীদের পেনশন নিশ্চিত করতে আইন পরিবর্তনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

কৃষি খাতকে লাভজনক করতে সরকারকে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কৃষকদের সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

দুধে ভেজাল, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন বাণিজ্যমন্ত্রী, কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ

দুধে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘গুরুতর হুমকি’ ও ‘ঘৃণ্য অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img