সম্প্রতি লালমনিরহাটের সীমান্তে একটি বাঘের(Leopard) উপস্থিতি স্থানীয় মানুষের মধ্যে যেমন বিস্ময় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, তেমনি পরিবেশবিদদের মনে করিয়ে দিয়েছে এক ঐতিহাসিক সত্য। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে- বিশেষ করে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও বা দিনাজপুর- ভারত থেকে মেছো বিড়াল, চিতাবাঘ এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অন্যন্য বন্যপ্রাণী সীমানা পেরিয়ে চলে আসার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। প্রশ্ন ওঠে, কেন এই সীমান্ত অঞ্চলে বারবার বাঘ বা বাঘজাতীয় বন্যপ্রাণী চলে আসে? এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ভূ-প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক, নিচে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করলাম।
১. ঐতিহাসিক অবিচ্ছিন্ন বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক করিডোর
একসময় ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজকের বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (ডুয়ার্স, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি) ও অসমের সমতল ভূমি ও পাহাড়ি বনাঞ্চল সম্পূর্ণ অবিচ্ছিন্ন ছিল। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকা ধরে বিস্তৃত ছিল ঘন বাঁশঝাড়, জঙ্গল ও কাশবন। যদিও ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং পরবর্তীকালে সীমান্ত বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে মানুষের রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক বাসস্থান বা ‘ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর’ (Wildlife Corridor)-কে সীমানা দিয়ে পুরোপুরি আলাদা করা যায়নি। প্রাণীগুলো তাদের বংশানুক্রমিক স্বাভাবিক বিচরণ পথ অনুসরণ করেই ঘোরাফেরা করে।
২. ডুয়ার্স অঞ্চল ও নেপালের পাহাড়ি পাদদেশের প্রভাব
উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট বা পঞ্চগড়ের খুব কাছেই অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ‘ডুয়ার্স’ (Dooars) অঞ্চল, গোরুমারা ও গরুমারা জাতীয় উদ্যান এবং বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প (Buxa Tiger Reserve)। এছাড়া নেপাল ও ভুটানের পাদদেশীয় ঘন বনাঞ্চলও খুব দূরে নয়। এসব বনে চিতাবাঘের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বনের জনসংখ্যা বেড়ে গেলে বা তরুণ চিতাবাঘগুলো নিজ ভূখণ্ড (Territory) দখল করতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ বাঘের তাড়া খেলে তারা তুলনামূলক নিরাপদ ও নতুন এলাকার খোঁজে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমান্তের সমতল অঞ্চলের দিকে চলে আসে।
৩. তিস্তা নদী ও নদীর চরাঞ্চলের ভূমিকা
উত্তরবঙ্গের আন্তর্জাতিক নদীগুলো (যেমন: তিস্তা ও ধরলা) ভারতের পাহাড় থেকে নেমে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে বা নদীর চরাঞ্চলে গজিয়ে ওঠা ঘন কাশবন, নলখাগড়ার জঙ্গল ও ঝোপঝাড় বন্যপ্রাণীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে লুকিয়ে যাতায়াতের আদর্শ পথ বা ‘মাইগ্রেটরি রুট’ হিসেবে সাহায্য করে। নদী অববাহিকার এই ঝোপঝাড় পার হয়ে প্রাণীগুলো সহজেই সীমান্ত অতিক্রম করে লালমনিরহাট বা আশপাশের লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।
৪. খাদ্য সংকট ও দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া
ভারতের ডুয়ার্স ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে মানববসতি বৃদ্ধি, চা বাগানের সম্প্রসারণ এবং পর্যটনের প্রসারের ফলে বাঘের প্রাকৃতিক শিকার (যেমন: হরিণ, বুনো শুশুক ইত্যাদি) কমে যাচ্ছে। খাদ্যের সন্ধানে প্রাণীগুলো বনের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের গৃহপালিত পশু (ছাগল, হাঁস-মুরগি, বাছুর) শিকারের উদ্দেশ্যে লোকালয়ে চলে আসে এবং পথ হারিয়ে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
৫. ঐতিহাসিক চারণভূমির স্মৃতি (Genetic Memory)
বাঘ এবং চিতাবাঘের মতো প্রাণীদের মধ্যে বংশানুক্রমিক জিনে অর্জিত স্মৃতি বা ‘জেনেটিক মেমোরি’ থাকে। বহু শতাব্দী ধরে তাদের পূর্বপুরুষেরা যেসব পথে খাদ্যের সন্ধানে ভ্রমণ করেছে, তারা অবচেতনভাবেই সেই পুরোনো পথগুলো অনুসরণ করে। ফলে বর্তমানে যেখানে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি বা লোকালয় গড়ে উঠেছে, সেখানে শতবর্ষ আগে ঘন জঙ্গল থাকার কারণে প্রাণীগুলো আজও সেখানে চলে আসে।
বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিদদের মতে, সীমান্ত অতিক্রম করে চলে আসা এসব বাঘ বা চিতাবাঘ মূলত স্থানচ্যুত এবং আতঙ্কিত প্রাণী। উপযুক্ত প্রাকৃতিক করিডোর না থাকা এবং সীমান্ত এলাকায় মানুষের ঘনবসতি বাড়ার কারণে এগুলো প্রায়শই লোকালয়ে এসে আটকে পড়ে। এই ঘটনার পেছনে যেমন রয়েছে তাদের প্রাকৃতিক অভ্যাসের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, তেমনি রয়েছে মানুষের তৈরি ভৌগোলিক সীমানা ও আবাসন বিস্তারের প্রভাব।
পরিশেষে বলতে চাই মানুষ তার রাজনৈতিক সীমানা যেভাবেই তৈরি করুক না কেন বন্যপ্রাণীরা সেটা কখনো অনুসরণ করে না। ঐতিহাসিক ভাবে তাদের এই চারণভূমি এবং তাদের জিনে থেকে যাওয়া পথ গুলো অনুসরণ করে তারা চলে আসছে। এখানে মানুষের করণীয় হলো লাঠিশোটা নিয়ে তাকে হ/ত্যা না করে, বরং রেসকিউ বা উদ্ধার করতে বনবিভাগ এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে সহায়তা করা।
সূত্র: Rakib al mim, Founder: Snake Rescue & Wildlife Awareness Organization Rangpur.






