বাংলাদেশের অস্তিত্ব কৃষির সঙ্গে জড়িত। একটি বিশাল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে গণমাধ্যমে কৃষি ও কৃষকদের গুরুত্ব কম দেয়া হয়। বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও ফসলের ন্যায্যমূল্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় যথাযথ মনোযোগ দেয়া হয় না। বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক, দেশের পরিস্থিতি, প্রাণ-প্রকৃতি, শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে কখনই পরিকল্পনা করা হয়নি।
গত কয়েক মাসে শুধু ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ১৩ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। ক্যান্সার হাসপাতালের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ ক্যান্সার রোগী কৃষক। এ তথ্যও অত্যন্ত উদ্বেগের।
যেভাবে বাছবিচারহীনভাবে কৃষিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, তার ফলস্বরূপ কৃষক একদিকে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তাদের জীবনীশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। আমরা যে খাবার খাচ্ছি মাছ, মাংস, ফল সবকিছুই ক্রমে বিষাক্ত হয়ে উঠছে। কার্যত আমরা বিষ গ্রহণ করছি। বিষাক্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার ব্যয় থেকেও জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। আমরা যে উন্নয়ন দেখছি তা জীবন ও অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষি ও কৃষক—এ বিষয়গুলোকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
একেক দেশের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা ভিন্ন। বাংলাদেশের মূল শক্তি হলো উর্বর জমি ও নদ-নদী-খাল-বিলের মতো বিশাল জলসম্পদ, যা খুব কম দেশেই আছে। এ উর্বর মাটিতে যেকোনো ফসল ও ঔষধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ সহজেই জন্মাতে পারে। সীমিত জমি ও বিশাল জনসংখ্যা আমাদের সীমাবদ্ধতা। এ জমি ও পানি কোনোভাবেই নষ্ট করা উচিত না। খাদ্য ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি ও কৃষককে নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
অতি উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, যান্ত্রিক সেচ ও কীটনাশকের প্যাকেজের মাধ্যমে যে সবুজ বিপ্লব ঘটানো হয়েছে, তার সুফল-কুফল নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি, যা দেশের স্বার্থে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার পরও আমাদের কৃষিসহ সেচ ব্যবস্থা পাকিস্তানি মডেলেই রয়ে গেছে। শিল্পায়নের ফলে দূষণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছে। শহরের চারপাশের নদীর কালো পানি ফসলের মাঠ ও মাছের খামারে যাচ্ছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে কৃষিজমি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ব্যবহার এবং ইটের ভাটার কারণে উর্বর জমি নষ্ট হচ্ছে।
ফসলের বীজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বাজারজাত করা পর্যন্ত কৃষক নানা জটিলতায় আটকে আছেন। তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সরকারের দুর্বল সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সবুজ বিপ্লবের মতো জোর-জবরদস্তিমূলক ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ তাদের জীবন নিয়ে কী হচ্ছে তা জানতে পারে না। যেকোনো নীতি জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে হবে এবং সামাজিক বিপদের দায় কোম্পানি বা নীতিনির্ধারকদের নিতে বাধ্য করতে হবে।
আশা করি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী মেগা প্রকল্পগুলো বন্ধ করবেন, কারণ এগুলো দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনছে। কৃষি, কৃষক ও সর্বোপরি মানুষের মঙ্গলের জন্য প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা জরুরি। আমাদের হারিয়ে যাওয়া ধান ও বীজের জাতগুলো পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় বীজ ভ্যারাইটির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য গবেষণার ওপর জোর দেয়া উচিত। সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করলে টেকসই ও প্রকৃতিবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য গবেষণা করা তাদের দায়িত্ব।






