বাংলাদেশ এশিয়ার কয়েকটি বৃহৎ নদ-নদীর মিলনভূমি। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা নদী বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীগুলোর অববাহিকা দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও হিমালয় পর্বতমালাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। গঙ্গা নদীর উৎপত্তি হিমালয়ের দক্ষিণ ঢাল থেকে, ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি তিব্বতের কৈলাস অঞ্চলে এবং মেঘনার উপনদীগুলো এসেছে নাগা, লুসাই, গারো ও জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার শাখা বা উপনদী। কিছু নদী ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি ও লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে সরাসরি সাগরে মিলিত হয়েছে। বাংলার সমভূমি রাজনৈতিক কারণে ভারত ও বাংলাদেশে বিভক্ত হলেও নদীগুলোর প্রবাহ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ধরলা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর মতো অনেক নদী একাধিক দেশ অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জলসম্পদ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও নির্ভরশীল।
ভূপরিস্থ জল সম্পদ
বাংলাদেশে ভূপরিস্থ জলসম্পদের প্রধান উৎস হলো বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা নদীর প্রবাহ। দেশে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২৩০০ মিলিমিটার। এর ফলে বিপুল পরিমাণ জলসম্পদ সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত নদীর প্রবাহ বাংলাদেশের নদীগুলোকে সমৃদ্ধ করেছে। এই জলসম্পদ কৃষি, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর নদীগুলো বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে আনে, যা প্লাবনভূমি সৃষ্টি ও ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি বন্যার সৃষ্টি করে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দেখা দেয়।
ভূপরিস্থ জলের ওঠানামা
বাংলাদেশের নদীগুলোর পানির পরিমাণ ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও উজানের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে নদীগুলো ফুলে-ফেঁপে ওঠে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যায়। সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের নদী, বৃষ্টিপাত ও বাষ্পীভবনের তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ করে। আন্তর্দেশীয় নদীগুলোর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন কাজ করছে। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
জলাভূমি ও জলাধার
বাংলাদেশে অসংখ্য বিল, হাওর, বাওড় ও পুকুর রয়েছে। এগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার হিসেবে কাজ করে। বর্ষায় এসব জলাভূমি পানিতে ভরে ওঠে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে রাখে। হাওর ও বিল বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাওড়গুলো মৃত নদীর বাঁক থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দেশের গ্রামাঞ্চলে পুকুর মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত কাপ্তাই বাঁধ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়।
পানি প্রত্যাহার ও সংকট
উজানে ভারত বিভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রবাহ কমে গেছে। গঙ্গার ফারাক্কা ব্যারেজ ও তিস্তা ব্যারেজ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং কৃষিতে ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশেও সেচের জন্য বিভিন্ন ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে, যেমন তিস্তা, মনু ও টাঙ্গণ প্রকল্প। তবে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে অনেক খাল ও নদী শুকিয়ে গেছে।
উপকূলীয় জলসম্পদ
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অসংখ্য খাড়ি ও মোহনা রয়েছে। এসব অঞ্চলে মিষ্টি ও লবণাক্ত পানির মিশ্রণে বিশেষ প্রতিবেশ গড়ে উঠেছে। বর্ষায় নদীর পানির প্রবাহ বেশি থাকায় লবণাক্ততা কমে যায়, আর শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়।
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যা উপকূলীয় জলসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ও পোল্ডার নির্মাণের মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির প্রভাব থেকে মানুষ ও কৃষিজমি রক্ষা করা হয়। এছাড়া পুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে মানুষ পানীয় ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলসম্পদ দেশের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অপরিহার্য। নদী, জলাভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চল দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে উজানে পানি প্রত্যাহার, নদী দূষণ, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। তাই টেকসই ব্যবস্থাপনা, আন্তর্দেশীয় সহযোগিতা এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জলসম্পদ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।






