আগামরা রোগের থাবায় সুন্দরবনের ১৩ কোটি সুন্দরীগাছ, বাড়ছে বাস্তুতন্ত্রের শঙ্কা

সুন্দরবনের প্রতি ১০টি সুন্দরীগাছের মধ্যে প্রায় চারটি আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত গাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৯৫ লাখে। এর মধ্যে ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ গুরুতরভাবে আক্রান্ত। একই সঙ্গে কমছে বনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের হার। গত ৩৬ বছরে সুন্দরবনের প্রতি হেক্টরে চারার ঘনত্ব কমেছে প্রায় ৭১ শতাংশ। কমেছে বনের কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতাও।

২০২৪-২৫ সালে দুই বছর ধরে সুন্দরবনের সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। সুন্দরবনের বন্য প্রাণী, বায়ু, মাটি, পানি ও বৃক্ষসম্পদ নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন ভবনে এক কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সুন্দরবনে বর্তমানে সুন্দরীগাছের সংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি। এর মধ্যে ৩৯ শতাংশ গাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত। রোগটির প্রভাবে প্রথমে গাছের পাতা আক্রান্ত হয়। পরে ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে যায়। একপর্যায়ে গাছের মূলকাণ্ডও ধ্বংস হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, পলিপতন, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তন বনের স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি করছে। এর ফলে বনের গাছপালার বিস্তার, কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতা এবং বন্য প্রাণীর আবাস ও বিস্তরণে পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণাটি করেছেন সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্বপন সরকার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে ১৯৮৬ সাল থেকে ১২০টি স্থায়ী জরিপ প্লট রয়েছে। এসব প্লটে থাকা গাছের পরিবর্তন শনাক্ত করে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ১৯৮৬ সালের তুলনায় টপ-ডাইং রোগ কিছুটা কমলেও গুরুতরভাবে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চ ও মাঝারি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।

গুরুতর আক্রান্ত দুই কোটির বেশি গাছ

আগামরা রোগে আক্রান্ত গাছের অবস্থা এক রকম নয়। গাছের পাতা, শাখা-প্রশাখা ও মূলকাণ্ড কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ভিত্তিতে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে ২৫ শতাংশের কম আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ৮ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার। ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ আক্রান্ত গাছ রয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার। আর ৫০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত, অর্থাৎ পাতা, শাখা-প্রশাখা ও মূলকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন গাছের সংখ্যা ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার। সব মিলিয়ে সুস্থ সুন্দরীগাছের সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি।

অধ্যাপক স্বপন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৯৮৬ সালে গুরুতর অসুস্থ গাছের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার। সেটি এখন ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছেছে। এটা ভাবনার বিষয়। দীর্ঘ মেয়াদে এসব প্রবণতাকে পর্যবেক্ষণে রেখে আমাদের সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।’

গবেষণায় সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক স্বাস্থ্য রক্ষায় লবণাক্ততাকে অন্যতম গুরুতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বনের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল উচ্চ লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে আসা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে এ সংকট বাড়ছে।

যেসব এলাকায় রোগের প্রকোপ বেশি

গবেষণার সুবিধার্থে সুন্দরবনকে ৫৩টি কম্পার্টমেন্টে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্টাম, কাগা দোবেকি ও গেওয়াখালী এলাকায় আগামরা রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরা রেঞ্জের দোবেকি, চান্দপাই রেঞ্জের হারবাড়িয়া ও চড়াপুটিয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমনি।

১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও ইউনিভার্সিটি অব এবারডনের অধ্যাপক এরিক বোয়া ‘সিম্পটম অ্যান্ড কজেস অব টপ ডায়িং’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেন। সেই গবেষণায়ও লবণাক্ততা বৃদ্ধিকে রোগটির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

তবে অধ্যাপক স্বপন সরকারের মতে, বেশি লবণাক্ত অঞ্চলে রোগের প্রকোপ বেশি হলেও লবণাক্ততাই যে এর একমাত্র কারণ, তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

৩৬ বছরে চারার ঘনত্ব কমেছে ৭১ শতাংশ

সুন্দরীগাছের রোগের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের হার কমে যাওয়া। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে সুন্দরবনের প্রতি হেক্টরে গড়ে ২ হাজার ৬৮৯টি চারা ছিল। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৭৬টিতে। অর্থাৎ ৩৬ বছরে প্রতি হেক্টরে চারার ঘনত্ব কমেছে প্রায় ৭১ শতাংশ।

এ ছাড়া গত তিন দশকে সুন্দরবনের ভূ-উপরিস্থ জৈবভর বা বায়োমাস কমেছে ১৫ শতাংশ। গবেষণায় বনের কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, স্বাধীনতার আগে ও পরে মিলিয়ে এটি সুন্দরবনের প্রথম ভিত্তিমূলক সমীক্ষা। টপ-ডাইং সুন্দরবনের শতাব্দীপ্রাচীন সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবিলায় আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট আক্রান্ত গাছ চিহ্নিত করে কেটে ফেলত। ধারণা করা হয়েছিল, এতে সুস্থ গাছে রোগ ছড়ানো বন্ধ হবে। কিন্তু পদ্ধতিটি কার্যকর না হওয়ায় পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সুন্দরীর জায়গা নিচ্ছে অন্য প্রজাতি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে সুন্দরীগাছের টিকে থাকা, অন্য প্রজাতির গাছের বিস্তার এবং বন্য প্রাণীর ওপর এসব পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানতে ধারাবাহিক গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু সুন্দরবন নিয়ে একাডেমিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়মিত গবেষণার ঘাটতি রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ভিদের পর্যায়ক্রমিক বিস্তারের ক্ষেত্রে সুন্দরীগাছ সবার শেষে আসে। অর্থাৎ সুন্দরবনের কোনো খোলা জায়গায় প্রথমে অন্য প্রজাতির চারা জন্মায়, পরে সুন্দরী সেখানে বিস্তার লাভ করে। এ কারণে সুন্দরীকে চূড়ান্ত পর্যায়ের উদ্ভিদ প্রজাতি বা ক্লাইম্যাক্স প্রজাতি বলা হয়। এটি সুন্দরবনের প্রাধান্য বিস্তারকারী বৃক্ষও।

অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামানের মতে, কোনো কোনো এলাকায় আগে যেখানে প্রচুর সুন্দরীগাছ ছিল, সেখানে এখন সিংড়া ও আমুরের মতো ছোট বৃক্ষের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম দেখা যাচ্ছে। কিছু এলাকায় সুন্দরীর অঞ্চলে গরানের বিস্তারও বাড়ছে। সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এ পরিবর্তনের প্রভাব বোঝা জরুরি। এ জন্য সরকার ও বন অধিদপ্তরের ধারাবাহিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

গবেষকদের মতে, সুন্দরীগাছের রোগ, চারার ঘনত্ব হ্রাস এবং অন্য প্রজাতির বিস্তার, এই পরিবর্তনগুলো সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। তবে বনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র, বন্য প্রাণী ও কার্বন সঞ্চয়ের ওপর এসব পরিবর্তনের পূর্ণ প্রভাব জানতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দরকার।

আরও পড়ুন

আদি মানুষ: তিন লাখ বছর আগের মানুষ দেখতে কেমন ছিল?

প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগের এক আদি মানুষের মুখচ্ছবি পুনর্গঠন করেছেন গবেষকরা। তাঁদের মতে, আধুনিক পোশাক পরিয়ে ওই মানুষকে আজকের মানুষের ভিড়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

বাঁশবাড়ি কলোনির উদ্যোগে মুগ্ধ প্রধানমন্ত্রী, দেখতে গেলেন পরিবেশমন্ত্রী

ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনির সড়কে একসময় ছিল আবর্জনার দুর্গন্ধ। এখন সেই সড়কের দুই পাশের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নানা প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহারের গাছ। অব্যবহৃত...
জাতীয়
0
minutes

অদ্ভুত বন্ধন: হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে অ্যামাজনকে পুষ্টি জোগায় সাহারা

একদিকে পৃথিবীর বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি সাহারা, অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অ্যামাজন বৃষ্টিঅরণ্য। ভৌগোলিকভাবে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুই অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

১৯৪ বছরের কচ্ছপ জোনাথন: যার জিনে মিলল দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য সূত্র

বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। অথচ খাবারের প্রতি আগ্রহ কমেনি, জীবনযাপনও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনসহ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী অ্যালডাব্রা...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img