একসময় অবৈধ শিকার, বন উজাড় আর মানুষের আগ্রাসনে বিপন্ন হয়ে পড়েছিল বন্য প্রাণীদের জীবন। বনে টিকে থাকাই ছিল তাদের জন্য কঠিন। অথচ সেই বনেই এখন দেখা মিলছে প্রায় ৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ১৪০ প্রজাতির পাখির। বিচরণ করছে বিপন্ন বন্য এশীয় হাতি, ক্যামেরায় ধরা পড়ছে বিপন্ন বনজ প্রাণীর উপস্থিতিও। প্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেত্রী ও মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।
ঘটনাটি কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সামলাউট বনাঞ্চলের। নিজের ছেলে ম্যাডক্সের জন্মভূমি কম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে জোলি দেশটির প্রকৃতি ও মানুষের জীবন সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। বনাঞ্চলে অবৈধ শিকার ও গাছ কাটার মতো সমস্যা সম্পর্কে জানার পর তিনি সেখানে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ম্যাডক্স জোলি-পিট ফাউন্ডেশন স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে বন ও বন্য প্রাণী রক্ষায় কাজ করছে। 
এই উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু বন রক্ষায় অর্থ ব্যয় করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে বন্য প্রাণী নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারে এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও প্রকৃতি সংরক্ষণের সম্পর্ক তৈরি হয়।
৯৬ একর জমি কেনা থেকে বৃহত্তর বন সংরক্ষণের উদ্যোগ
২০০২ সালের দিকে কম্বোডিয়ার সামলাউট বনাঞ্চলের অবৈধ শিকার, বেআইনি গাছ কাটা ও পরিবেশের অবক্ষয় জোলির নজরে আসে। এই পরিস্থিতিতে বনাঞ্চল সংরক্ষণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি সেখানে প্রায় ৩৯ হেক্টর বা ৯৬ একর জমি কেনেন। এই জমি কেনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর সংরক্ষণ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, জোলি পুরো বনাঞ্চলটি ব্যক্তিগতভাবে কিনে নেননি। তাঁর ফাউন্ডেশন কম্বোডিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে সামলাউট মাল্টিপল ইউজ এরিয়ার বৃহত্তর বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আয়তন প্রায় ৬০ হাজার ৯৯৪ হেক্টর, যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৭২০ একরের সমান।
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত উদ্যোগে জমি কেনা ছিল বৃহত্তর সংরক্ষণ প্রচেষ্টার একটি অংশ; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বন ব্যবস্থাপনা, বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ।
বনে ফিরেছে জীববৈচিত্র্যের স্পন্দন
সামলাউট বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে পাওয়া তথ্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে। বিভিন্ন জরিপে এখানে প্রায় ৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ১৪০টির বেশি প্রজাতির পাখির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে বিপন্ন এশীয় হাতি, সুনডা বনরুই এবং এশীয় বন্য কুকুর বা ধোল।
২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত একটি জীববৈচিত্র্য জরিপে ক্যামেরা ট্র্যাপসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে বন্য প্রাণীর উপস্থিতি অনুসন্ধান করা হয়। জরিপের ফলাফল ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়। এতে বনাঞ্চলটির পরিবেশগত গুরুত্ব এবং বিপন্ন প্রজাতির জন্য এর প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
বন্য প্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক লক্ষণ। তবে কোনো এলাকায় প্রাণী পাওয়া গেলেই সেখানে শিকার পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে বা সব প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।
শিকারিদের প্রতিরোধে পাহারায় স্থানীয় মানুষ
বন সংরক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো নিয়মিত নজরদারি। কারণ, সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করলেই অবৈধ শিকার কিংবা গাছ কাটা বন্ধ হয়ে যায় না।
সামলাউটে বনরক্ষীরা নিয়মিত টহল দেন। অবৈধ শিকারের ফাঁদ অপসারণ, বনাঞ্চলের ওপর নজরদারি এবং বন্য প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ করেন তাঁরা। ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বনরক্ষীরা প্রায় ৭ হাজার ৮০০ মিটার তারের ফাঁদ অপসারণ করেন। এত বিপুল পরিমাণ ফাঁদ অপসারণের তথ্যই জানিয়ে দেয়, বন্য প্রাণীর জন্য হুমকি এখনো রয়ে গেছে।
এই উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের কাজে সম্পৃক্ত করা। বন সম্পর্কে যাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বনরক্ষার কাজে যুক্ত করা হলে একদিকে যেমন নজরদারি বাড়ে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়।
বন বাঁচলে জীবিকাও বাঁচে
বন সংরক্ষণকে স্থানীয় মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা পাওয়া কঠিন। মানুষের খাদ্য, আয় ও জীবিকার প্রয়োজন পূরণ না হলে বনভূমির ওপর চাপ বাড়তে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সামলাউটের উদ্যোগে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি বিকল্প জীবিকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফাউন্ডেশন স্থানীয় কৃষকদের টেকসই মৌমাছি পালন ও মধু উৎপাদনে উৎসাহিত করছে। এ ধরনের উদ্যোগে বন অক্ষত রাখা স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হয়। বন ভালো থাকলে মৌমাছির আবাস ও খাদ্যের উৎস টিকে থাকে; আর সেখান থেকে পাওয়া মধু বিক্রি করে পরিবারগুলো আয় করতে পারে। নারীদেরও এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নেও ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। ফলে প্রকৃতি সংরক্ষণ এখানে কেবল বন্য প্রাণী রক্ষার প্রকল্প নয়; বরং মানুষ ও পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর উদ্যোগ।
প্রকৃতি সংরক্ষণে এই উদ্যোগের শিক্ষা
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির উদ্যোগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা পাওয়া যায়, প্রকৃতি রক্ষায় শুধু অর্থ ব্যয় বা জমি কেনাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক জরিপ, নিয়মিত নজরদারি, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ।
বিশেষ করে এশীয় হাতির মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য বনাঞ্চলের আয়তনের পাশাপাশি নিরাপদ বিচরণপথ ও এক বন থেকে অন্য বনের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা জরুরি। একইভাবে বনরুইয়ের মতো বিপন্ন প্রাণীর জন্য শিকার ও অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্য প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ।
সামলাউটের অভিজ্ঞতা আরও দেখায়, বন সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের আয়, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নের সঙ্গে বন রক্ষার সম্পর্ক তৈরি করা গেলে সংরক্ষণ কার্যক্রম দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
একসময় যে বনাঞ্চল অবৈধ শিকার ও পরিবেশ ধ্বংসের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছিল, সেখানে আজও এশীয় হাতি, বনরুইসহ নানা বন্য প্রাণীর উপস্থিতি আশার বার্তা দেয়। এই পরিবর্তনের পেছনে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির উদ্যোগে গড়ে ওঠা ফাউন্ডেশনের ভূমিকা রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় মানুষ, বনরক্ষী, গবেষক ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
তবে এই অর্জনকে চূড়ান্ত সাফল্য ভাবার সুযোগ নেই। অবৈধ শিকার, বনভূমি দখল ও গাছ কাটার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে নিয়মিতভাবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করা কোনো এককালীন কাজ নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করার দায়িত্ব।
সামলাউটের গল্প তাই শুধু একজন বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রীর পরিবেশ উদ্যোগের গল্প নয়; এটি এমন এক সম্ভাবনার গল্প, যেখানে মানুষের সদিচ্ছা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ প্রচেষ্টা একসঙ্গে কাজ করলে বন্য প্রাণীর জন্য নিরাপদ আবাসস্থল টিকিয়ে রাখা সম্ভব।






