ডেস্ক রিপোর্ট, চট্টগ্রাম
দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ভরাট, শিল্প ও পয়ঃবর্জ্যের চাপে দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী কর্ণফুলী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি কমছে জলজ জীববৈচিত্র্য। নদীর পানি ও তলদেশের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
‘মেরিন পলিউশন বুলেটিন’-এর ২১৬তম খণ্ডে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্ণফুলী নদীর পানি ও পলিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক পলিউশন ইন দ্য ওয়াটার অ্যান্ড সেডিমেন্ট অব দ্য কর্ণফুলী রিভার, বাংলাদেশ: অ্যান ইকোলজিক্যাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় নদীর দুই তীরের ২৪টি স্থান থেকে তিন মৌসুমে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৪ দশমিক ২৪ থেকে ২৬ দশমিক ৬৮টি এবং প্রতি কেজি শুকনো পলিতে ৭৫ দশমিক ৬৩ থেকে ২৭২ দশমিক ৪৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। নিম্নপ্রবাহে এসব কণার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল। ০ দশমিক ৩ থেকে ৫ মিলিমিটার আকারের এসব কণার মধ্যে আঁশজাতীয় ও কালো কণার আধিক্য ছিল। গবেষকেরা কর্ণফুলীর মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নদীর প্রস্থ কমে যাওয়ার চিত্রও উঠে এসেছে বিভিন্ন জরিপে। ২০১৪ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে করা জরিপে চাক্তাই খালের মুখে কর্ণফুলীর প্রবহমান অংশের প্রস্থ ৯৩৮ মিটার, রাজাখালী খালের মুখে ৮৯৪ মিটার এবং শাহ আমানত সেতুর নিচে ৮৬৬ মিটার পাওয়া যায়।
এর ছয় বছর পর ২০২০ সালের জরিপে চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন দাবি করে, শাহ আমানত সেতুর নিচে ভাটার সময় প্রবহমান অংশের প্রস্থ কমে প্রায় ৪১০ মিটারে এবং জোয়ারের সময় প্রায় ৫১০ মিটারে দাঁড়িয়েছে। একই জরিপে চাক্তাই খালের মুখে ৪৩৬ মিটার এবং রাজাখালী খালের মুখে ৪৬১ মিটার প্রস্থ পাওয়া যায় বলে সংগঠনটি জানায়।
নদীর দুই তীর দখলের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও উদ্ধার করা জায়গার কিছু অংশে ফের দখলের অভিযোগ উঠেছে। ফিরিঙ্গিবাজার থেকে নতুন ব্রিজের পশ্চিম পাশ পর্যন্ত নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে নতুন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
কর্ণফুলী দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস নগরীর খালগুলো। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষায় নদীর ৭৯টি স্থানে দূষণের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৭৭টি স্থানে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নগরীর ২৩টি স্থান দিয়ে দূষণকারী বর্জ্য নদীতে পড়ছে এবং ১৯টি খাল শিল্প ও গৃহস্থালির বর্জ্য বহনের নালায় পরিণত হয়েছে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
ডায়িং কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তেলের ডিপো, সার কারখানা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পের তরল ও রাসায়নিক বর্জ্য বিভিন্ন খাল-নালা হয়ে কর্ণফুলীতে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পয়ঃবর্জ্য, জাহাজের পোড়া তেল, গৃহস্থালির আবর্জনা এবং কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের বর্জ্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, একসময় কর্ণফুলীতে মাছের বৈচিত্র্য অনেক বেশি ছিল। দূষণের কারণে বর্তমানে অনেক প্রজাতির মাছ আগের মতো পাওয়া যায় না। টেংরা জাতীয় মাছ, ফাইস্যা, পোয়া ও কাঁচকি ছাড়া অনেক প্রজাতির মাছের উপস্থিতি কমে গেছে।
তিনি বলেন, কর্ণফুলীর দখল ও দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। নদী রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। নদীর জায়গা রক্ষা করা ছাড়া এর পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। উদ্ধার করা জায়গার সীমানা নির্ধারণের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা একই সঙ্গে কর্ণফুলীর সংকট বাড়াচ্ছে। দ্রুত দখল উচ্ছেদ, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
কর্ণফুলী রক্ষার বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান নদীটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্ণফুলীকে রক্ষা করতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্প ও পয়ঃবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরিবেশগত নজরদারি জরুরি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জলধারণ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব শুধু পরিবেশে নয়, চট্টগ্রাম বন্দর, নৌবাণিজ্য, মৎস্যসম্পদ ও নগর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।






