বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মাটি খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এতে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ মাটির অবস্থা উন্নত করতে কার্যকর ও প্রমাণিত পদক্ষেপগুলো ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, ‘বিশ্বব্যাপী, আমাদের মাটি শোষণের মানসিকতা থেকে সরে এসে মাটি সুরক্ষার মানসিকতা গ্রহণ করতে হবে।’
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মাটি আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ৯৫ শতাংশ জোগান দেয়, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের ৫৯ শতাংশ ধারণ করে এবং মহাসাগরের পর গ্রহের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন সিঙ্ক (সংরক্ষণাগার) হিসেবে কাজ করে। তা সত্ত্বেও মাটির অবক্ষয় আশঙ্কাজনক হারে ত্বরান্বিত হচ্ছে।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের ৫২.৫ শতাংশ অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলে মাটির ব্যবস্থাপনা ছিল খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ। এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় এটি ছিল মাঝারি মানের। আর মাত্র ১৪ শতাংশ অঞ্চলে মাটির অবস্থা ভালো বা খুব ভালো।
২০১৫ সালের একটি রূপরেখামূলক প্রচেষ্টার পর বিশ্বজুড়ে মাটির স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করে এটি এফএওর দ্বিতীয় প্রধান প্রতিবেদন। প্রথম গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, বিশ্বের বেশির ভাগ মাটিই মাঝারি, খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
বাড়ছে জমির ওপর চাপ
এফএও জানিয়েছে, ওই সময়ের পর থেকে বিশ্বের জনসংখ্যা ৮০ কোটি বেড়েছে। এর ফলে আরও ৮ কোটি হেক্টর বা প্রায় ২০ কোটি একর অতিরিক্ত জমি প্রধান প্রধান ফসল চাষের আওতায় আনা হয়েছে। এই আয়তন প্রায় ফ্রান্স ও জার্মানির সম্মিলিত আয়তনের সমান।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মাটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ক্ষয়। টেকসই নয় এমন বা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারণে মাটি ধুয়ে যাচ্ছে কিংবা বাতাসে ভেসে যাচ্ছে।
এ ছাড়া মাটিতে জৈব পদার্থ বা সয়েল অর্গানিক কার্বনের পরিমাণ কমে যাওয়া, পুষ্টি উপাদানের অব্যবস্থাপনা, মাটির জীববৈচিত্র্য হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ এবং নগরায়ণ বা শহরের সম্প্রসারণও মাটির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এসব সমস্যার অধিকাংশকেই আরও তীব্র করে তুলতে পারে। অন্যদিকে মাটির অবক্ষয়ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। তবে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করা গেলে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও সহায়তা করতে পারে।
৫৮ শতাংশ এলাকায় অবনতি
প্রতিবেদনের লেখকেরা বলেছেন, মাটি রক্ষা ও পুনর্গঠনের অধিকাংশ কৌশল ২০১৫ সালের আগেই ভালোভাবে জানা ছিল। কিন্তু এরপরও সেগুলো ব্যাপকভাবে প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।
তারা জানান, জরিপ করা এলাকাগুলোর মাত্র ১০ শতাংশে মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে ৫৮ শতাংশ এলাকাতেই মাটির অবস্থার অবনতি ঘটেছে।
মাটির অবক্ষয় কমানোর অন্যতম প্রধান পদ্ধতি হলো জমি চাষের মাত্রা কমিয়ে আনা বা একেবারেই বন্ধ করা। লাঙল বা ট্রাক্টর দিয়ে চাষের এই পদ্ধতি কৃষির মতোই প্রাচীন। তবে এটি মাটির ভেতরের জৈব জীবন ধ্বংস করে এবং মাটি আলগা করে ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়।
মাটি রক্ষায় বিকল্প পদ্ধতি
মাটি রক্ষা ও এর স্বাস্থ্য উন্নত করার অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ‘কভার ক্রপ’ বা প্রতিরক্ষামূলক ফসল রোপণ। শিমজাতীয় উদ্ভিদ ও সরিষাজাতীয় শাকসবজির মতো ফসল অনাবাদী জমিতে চাষ করা হয়, যাতে মাটির ক্ষয় রোধের পাশাপাশি এর পুষ্টি উপাদান বাড়ানো যায়।
এ ছাড়া রয়েছে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বা কৃষি-বনায়ন। এতে কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে গাছপালাকে সমন্বিত করা হয়।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সারের উন্নত ও সুষম ব্যবহারও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান কৌশল। কারণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে সার ব্যবহার করা হলে তা নিজেই দূষণের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
কৃষকদের সামনে বড় বাধা খরচ
এফএও জানিয়েছে, উন্নত মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে কৃষকদের প্রধান বাধা জ্ঞানের অভাব নয়; বরং সম্পদের সীমিত সুযোগ এবং প্রাথমিক পর্যায়ের উচ্চ খরচ।
সংস্থাটি কৃষকদের জন্য আরও আর্থিক প্রণোদনা, আঞ্চলিক তথ্য-উপাত্তের সরবরাহ বাড়ানো এবং স্থানীয় বা আদিবাসী জ্ঞানের ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটারে মরুভূমিকরণ সংক্রান্ত কপ-১৭ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা যখন খরা মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রত্যাশায় সমবেত হয়েছেন, ঠিক তখনই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো।
এর দুই বছর আগে রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ-১৬ সম্মেলন কোনো ধরনের চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল।
সূত্র: The Business Standard বাংলা






