এস এম হুমায়ুন কবির
দেশের প্রধানতম ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় ২টি বনের একটি চকরিয়া সুন্দরবন। বর্তমানে বনটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ভুলে!
চরনদ্বীপ, রামপুর, পালাকাটা, রিংভং এবং বদরখালী মৌজা ঘিরে ছিল চকরিয়া সুন্দরবনের পরিধি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৩ সালে বৃটিশ সরকার চকরিয়া সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে বৃটিশরা ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে ২৬০ টি ভূমিহীন পরিবারকে বসতি স্থাপনের জন্য ইজারা প্রদান করেন এই বনের সিংহভাগ। সেখান থেকেই বিপর্যয়ের শুরু। ধীরে ধীরে জৌলুশ হারিয়ে ফিকে হতে থাকা বনটি ১৯৭০ সালেও আলো ছড়াচ্ছিলো। ধীরে ধীরে সেই আলো মৃয়মান হতে থাকে। বর্তমান সময়ে এসে একটি মাত্র সুন্দরী গাছ অবশিষ্ট আছে তার, নিভে গেছে সব আলো!
মূলত ১৯৭৮, ১৯৮৫ এবং ১৯৯৬ সালে চিংড়ি চাষের জন্য মোট বনভূমির প্রায় সবটুকু জমি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বনবিভাগের নিকট থেকে মৎস্য বিভাগকে লিজ প্রদানের মাধ্যমেই বনটি বিলুপ্ত হয়! ১৯৭৮ সালে এই বন উজাড়ের মাধ্যমে চিংড়ি চাষ প্রকল্পে ২৬.৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ণ করে UNDP এবং World Bank।
চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে নানামুখী কাজ করছেন পরিবেশবাদী উন্নয়ন সংগঠক মোঃ সোহরাব হোসেন! মূলত তারই একান্ত প্রচেষ্টায় প্রথম আলো এবং চ্যানেল আই-এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি উঠে এসেছে! জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়েছে কিভাবে একটি বন উজার করে বসতি, মৎস্যঘের, চাষের জমি বানিয়ে ফেলেছে এলাকার মানুষ! সত্যিই বিস্ময়কর তথ্য! আমরা কেবল নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের ক্ষতি করে যাচ্ছি তা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছি ঘোর অন্ধকারে!
ভাবুনতো একসময় এই বন প্রায় অর্ধশত প্রজাতির গাছ, লতাগুল্ম ও পশুপাখির কলকাকলিতে মুখর ছিল। আয়তন ছিল ৩০ বর্গকিলোমিটারের বেশি। জোয়ার ভাটার পানিতে বনের নিম্নাঞ্চল ভেসে যেত, যেখানে সাগরের নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। বন ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে ছিল গভীর মিতালী। আজ সেখানে অবশিষ্ট আছে কেবল “একটি মাত্র সুন্দরী গাছ”! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়-তাই না! হ্যা, এটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা!
এভাবে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে কেবল একটি বনই উধাও হয়নি; প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ নিঃশেষ হয়েছে, বননির্ভর বহুমানুষ তাদের পেশা হারিয়েছে, নষ্ট হয়েছে জলাভূমি, বেড়েছে মাটির লবণাক্ততা, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস রোধের প্রাকৃতিক বর্ম ধ্বংস হয়েছে। এ সবের আর্থিক মূল্য পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক আক্ষেপ, যদি বনটা থাকতো তাহলে কতো বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতো আমাদের চকরিয়া!
প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয় থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে না পারলে ১৯৯১ সালের মতো মহাবিপদে পড়তে হবে সন্দেহ নেই। সেদিন ঘুর্ণিঝড় ম্যারি অ্যান-এ নিমিষেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলো লাখো মানুষ।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনতে পারলে এই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবীকা বিপন্ন হওয়া থেকে যেমন রক্ষা পাবে তেমনি প্রকৃতি ফিরে পাবে তার নিজস্ব সৌন্দর্য।
এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগ এবং দেশি-বিদেশি সংস্থায় কর্মরত অনেকেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, চাইলেই এই বন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রয়োজন বন বিভাগের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সরকারের বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির আওতায় বৃক্ষ রোপণ এবং যে একটি সুন্দরী গাছ অবশিষ্ট আছে তা যেনো কোনো ভাবেই কেটে ফেলা না হয়! এই গাছটি দেখে অন্তত মানুষ মনে করতে বাধ্য হবে এখানে চকরিয়া সুন্দরবন নামে একটা বন ছিলো। আমরা যাকে ধ্বংস করেছি!
সোহরাব হোসেন চকরিয়া সুন্দরবনের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে BID4CJ প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার বাইন গাছ রোপন করেছেন! তার তত্ত্বাবধানে আরো ৫০ হাজার বাইন গাছ রোপণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে! একইভাবে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে অন্যরাও এগিয়ে এলে হয়তো আবারও প্রাণ ফিরে পাবে চকরিয়া সুন্দরবন!
লেখক: প্রশিক্ষক ও নির্মাতা
সূত্র: বাংলাভিশন






