সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসে তীক্ষ্ণ অথচ সুরেলা এক ডাক। থেমে থেমে সেই ডাক অনেকটা বাঁশির সুরের মতো। এটাই দোয়েল, কালো-সাদা ছোট্ট একটি পাখি, যাকে বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর, প্রায় সর্বত্রই কোনো না কোনো সময় দেখা যায়।
প্রতিদিন চোখের সামনে দেখা এই পাখিটিই যে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি, সেটি হয়তো অনেকের কাছেই খুব সাধারণ একটি তথ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত রঙিন ও আকর্ষণীয় পাখির ভিড়ে দোয়েলকেই কেন জাতীয় পাখির মর্যাদা দেওয়া হলো?
এর পেছনে রয়েছে দোয়েলের স্বভাব, মানুষের সঙ্গে তার সহজ সহাবস্থান এবং বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক।
স্বাধীনতার পর জাতীয় প্রতীকের তালিকায় দোয়েল
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন জাতীয় প্রতীকগুলো নির্ধারণ করছিল, তখন দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কাজী জাকের হোসেন দোয়েলকে জাতীয় পাখি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
দোয়েলের বৈজ্ঞানিক নাম Copsychus saularis। দেখতে ছোট হলেও স্বভাব ও গানের বৈচিত্র্যে পাখিটি অনন্য।
পুরুষ দোয়েলের মাথা, পিঠ ও শরীরের বেশির ভাগ অংশ কালো এবং বুক ও শরীরের কিছু অংশ সাদা। স্ত্রী দোয়েলের রং তুলনামূলক ফিকে ধূসর। লম্বায় প্রায় ২০ সেন্টিমিটারের এই পাখিটি সাধারণত লেজ কিছুটা উঁচু করে চলাফেরা করে।
গানের জন্যই সবচেয়ে বেশি পরিচিত
দোয়েলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার গান। ভোরের নীরবতা ভেঙে তার সুরেলা ডাক মানুষের ঘুম ভাঙায়। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের সুরে ডাকতে পারে পাখিটি। এমনকি কখনো কখনো অন্য পাখির ডাকও অনুকরণ করতে দেখা যায়।
বাংলার গ্রামগঞ্জে দোয়েলের ডাক ঘিরে নানা লোকবিশ্বাসও রয়েছে। কারও কাছে এর ডাক শুভ দিনের বার্তা, আবার কারও কাছে দোয়েল সাহস ও দৃঢ়তার প্রতীক।
নিজের এলাকা রক্ষার ক্ষেত্রেও ছোট এই পাখিটি বেশ সাহসী। প্রয়োজন হলে বড় পাখির সঙ্গেও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।
ছোট পাখির মধ্যে বড় প্রতীক
একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় প্রতীক হিসেবে দোয়েলকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার এই স্বভাবও প্রতীকী অর্থ বহন করে বলে মনে করা হয়। আকারে ছোট হলেও প্রতিকূলতার কাছে নতি স্বীকার না করা এবং নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখার প্রবণতার সঙ্গে দোয়েলের স্বভাবকে অনেকে মিলিয়ে দেখেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন ছোট অথচ সাহসী ও প্রাণবন্ত এই পাখির সঙ্গে দেশের মানুষের মানসিকতারও একটি প্রতীকী মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে শুধু প্রতীকী কারণই নয়। বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের পরিবেশেই দোয়েলের উপস্থিতি রয়েছে। গ্রাম, শহর, বাগান, উঠান কিংবা রাস্তার পাশের গাছ, বিভিন্ন জায়গাতেই একসময় সহজেই দেখা মিলত এই পাখির।
কৃষকেরও বন্ধু দোয়েল
দোয়েল শুধু গানেই মানুষকে মুগ্ধ করে না; প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাতেও তার ভূমিকা রয়েছে।
মাটিতে নেমে খাবার খুঁজতে পছন্দ করে দোয়েল। পোকামাকড়, শুঁয়াপোকাসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণী তার খাদ্যের অংশ। বাগানের মাটি খুঁচিয়ে লুকিয়ে থাকা পোকাও খুঁজে বের করে খায়।
ক্ষতিকর পোকামাকড় খাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দোয়েলকে কৃষিবান্ধব পাখি হিসেবেও দেখা হয়।
আগের মতো কি দেখা যায় দোয়েল?
এখানেই রয়েছে উদ্বেগের জায়গা।
নগরায়ণের বিস্তারের সঙ্গে কমছে গাছপালা ও খোলা জায়গা। যে জায়গায় একসময় দোয়েল অনায়াসে মাটিতে নেমে খাবার খুঁজত, সেখানে এখন তৈরি হচ্ছে কংক্রিটের স্থাপনা।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে দোয়েলের দেখা পাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পোকামাকড়ের প্রাপ্যতা কমছে, যার প্রভাব দোয়েলের খাদ্যচক্রেও পড়তে পারে।
জাতীয় পাখির পরিচয় থাকলেই কোনো প্রাণী নিরাপদ থাকে না। তার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং অনুকূল পরিবেশ।
গাছের কোটরেই হতে পারে দোয়েলের ঘর
দোয়েল সাধারণত গাছের কোটর, দেয়ালের ফাঁকফোকর কিংবা এ ধরনের নিরাপদ জায়গায় বাসা তৈরি করে। একবারে সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি ডিম দিতে পারে। বাবা-মা দুজনই মিলে বাচ্চাদের খাবার জোগাড় ও দেখাশোনা করে।
বাংলার সাহিত্য, গান ও কবিতাতেও দোয়েলের উপস্থিতি তাই কেবল একটি পাখির ছবি নয়; এটি বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক পরিচিত প্রতীক।
জাতীয় পাখিকে বাঁচাতে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে
দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে চেনা শুধু তার নাম মুখস্থ রাখার বিষয় নয়। তার ডাক, আবাসস্থল, খাদ্যাভ্যাস এবং টিকে থাকার সংগ্রাম সম্পর্কে জানা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গাছ, কিছু খোলা মাটি, কীটপতঙ্গের স্বাভাবিক উপস্থিতি, এসবই দোয়েলের মতো ছোট পাখির বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িত।
তাই পরের কোনো ভোরে জানালার বাইরে সেই পরিচিত সুর শুনলে একটু থেমে তাকানো যেতে পারে। হয়তো কাছের কোনো গাছের ডালে বসে আছে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি, কালো-সাদা ছোট্ট দোয়েল। তার মিষ্টি ডাক মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখলেই কেবল জাতীয় প্রতীকগুলো বাস্তব জীবনে বেঁচে থাকবে।
সূত্র: কিশোর আলো






