উটের চোখের পানিতে ২৬ সাপের বিষের প্রতিষেধক, দাবিটি কতটা সত্য?

উটের চোখের পানিতে এমন অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা দুই ডজনেরও বেশি প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি কৌতূহল তৈরি করেছে। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাস্তবে উটজাতীয় প্রাণীর শরীরে তৈরি বিশেষ ধরনের ক্ষুদ্র অ্যান্টিবডি নিয়ে গবেষণা চলছে, যা ভবিষ্যতে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা লামা ও আলপাকা নামের উটজাতীয় প্রাণীকে বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিষ দিয়ে প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরিতে উদ্দীপ্ত করেন। পরে এসব প্রাণীর শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ভিত্তিতে ক্ষুদ্র অ্যান্টিবডি শনাক্ত ও নির্বাচন করে পরীক্ষামূলক প্রতিষেধক তৈরি করা হয়। গবেষণায় আটটি বিশেষ অ্যান্টিবডির সমন্বয়ে তৈরি প্রতিষেধক আফ্রিকার ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপের মধ্যে ১৭টির বিষের কারণে সৃষ্ট প্রাণঘাতী প্রভাব প্রতিরোধে কার্যকর হয়েছিল। তবে এটি ছিল পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণা, মানুষের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসা নয়। <Link url=”https://www.nature.com/articles/s41586-025-09661-0” title=”গবেষণাপত্রটি পড়ুন”/>।

কী এই ক্ষুদ্র অ্যান্টিবডি?

সাধারণ অ্যান্টিবডির তুলনায় আকারে অনেক ছোট এক ধরনের অ্যান্টিবডিকে ন্যানো-অ্যান্টিবডি বলা হয়। উট, লামা ও আলপাকার মতো প্রাণীর শরীরে বিশেষ ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যেগুলোর কার্যকর অংশ থেকে এসব ক্ষুদ্র অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব।

ছোট আকারের কারণে ন্যানো-অ্যান্টিবডি নির্দিষ্ট বিষাক্ত প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। গবেষণাগারে উপযুক্ত অ্যান্টিবডি নির্বাচন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে সাপের বিষের বিভিন্ন উপাদানকে লক্ষ্য করে প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা চলছে।

তবে সব ন্যানো-অ্যান্টিবডি একইভাবে কাজ করে না। কোন অ্যান্টিবডি কোন বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে তার গঠন, লক্ষ্যবস্তু এবং সংশ্লিষ্ট বিষের বৈশিষ্ট্যের ওপর।

একাধিক সাপের বিষের বিরুদ্ধে কাজ করার সম্ভাবনা

প্রচলিত সাপের বিষের প্রতিষেধক সাধারণত নির্দিষ্ট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপের বিষ ব্যবহার করে প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। পরে সেই অ্যান্টিবডি সংগ্রহ ও পরিশোধন করে চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।

এই পদ্ধতিতে তৈরি প্রতিষেধকের কার্যকারিতা সব প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধে সমান নয়। এক অঞ্চলের সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক অন্য অঞ্চলের একই গোত্রের সাপের বিষের বিরুদ্ধে কম কার্যকর হতে পারে।

এ কারণে বিজ্ঞানীরা এমন প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা করছেন, যা একই সঙ্গে একাধিক প্রজাতির সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারবে। ২০২৫ সালের গবেষণায় আটটি ন্যানো-অ্যান্টিবডির সমন্বয়ে তৈরি পরীক্ষামূলক প্রতিষেধক আফ্রিকার একাধিক বিষধর সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে বিস্তৃত কার্যকারিতার প্রতিষেধক তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

তবে গবেষণাটির ফলাফল থেকে এখনই বলা যায় না যে একটি প্রতিষেধক বিশ্বের সব বিষধর সাপের কামড়ে কার্যকর হবে। সাপের প্রজাতি, বিষের গঠন এবং বিষক্রিয়ার ধরন ভেদে চিকিৎসার কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে।

সাপের কামড়ের চিকিৎসায় কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সাপের কামড় একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো, উপযুক্ত প্রতিষেধক পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

ন্যানো-অ্যান্টিবডিভিত্তিক প্রতিষেধক ভবিষ্যতে তৈরি করা গেলে এর কয়েকটি সম্ভাব্য সুবিধা রয়েছে। নির্দিষ্ট বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি নির্বাচন করা, বিভিন্ন অ্যান্টিবডির সমন্বয়ে বিস্তৃত কার্যকারিতার প্রতিষেধক তৈরি করা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। মানুষের শরীরে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই, উপযুক্ত মাত্রা নির্ধারণ, উৎপাদনব্যয়, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমোদন, সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে।

তাহলে কি উটের চোখের পানি সাপের বিষের প্রতিষেধক?

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি বুঝতে হবে। উট বা উটজাতীয় প্রাণীর শরীরে বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু উটের চোখের পানিতে এমন কোনো প্রমাণিত উপাদান পাওয়া গেছে, যা সরাসরি দুই ডজনেরও বেশি সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করে, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

প্রকাশিত গবেষণায় লামা ও আলপাকার শরীরে সাপের বিষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে সেগুলো থেকে নির্বাচিত ন্যানো-অ্যান্টিবডি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, গবেষণার বিষয়টি উটের চোখের পানি নয়; বরং উটজাতীয় প্রাণীর অ্যান্টিবডির বিশেষ গঠনকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষামূলক প্রতিষেধক তৈরি করা।

বিজ্ঞানীরা সাপের বিষের চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু গবেষণাগারের সাফল্যকে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার আগে আরও পরীক্ষা ও ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।

তাই উটের চোখের পানিকে সাপের কামড়ের প্রতিষেধক ভাবার কোনো কারণ নেই। সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত প্রতিষেধক গ্রহণ করাই জীবন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন

ডাইনোসর বিলুপ্ত, তবু টিকে গেল কুমির: রহস্য উন্মোচন

পৃথিবী থেকে একসময় হারিয়ে গেছে বিশালাকার ডাইনোসর। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

ফুটপাতের পিঠা-পুরির দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়, কার্যকর ১ নভেম্বর থেকে

সড়কের পাশে পিঠা, পুরি, ঝালমুড়ি ও পেঁয়াজু বিক্রির দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকে নিবন্ধন...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes

শেষ ইচ্ছা ছিল বীজ বাঁচানো, ৬০ প্রজাতির ধানে বেঁচে থাকবেন রামেট্টন

কেরলের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামন নিজের জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণে। অর্থনৈতিক কষ্ট, ব্যক্তিগত ত্যাগ কিংবা...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img