সুপার এল নিনোর ভয়াবহ পূর্বাভাস: বাংলাদেশে ৬০০, বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ লাখের বেশি মৃত্যুর আশঙ্কা

শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে নতুন এক বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে তীব্র গরমের কারণে ৬০০ জনের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা বাস্তবে ঘটে যাওয়া প্রাণহানি নয়; জলবায়ু ও মৃত্যুহারের তথ্যের ভিত্তিতে মডেল ব্যবহার করে করা পূর্বাভাস।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের এই বিশ্লেষণে সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়ের অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। প্রতিবেদনে খরা, দাবানল ও বন্যার মতো এল নিনো-সম্পর্কিত অন্যান্য দুর্যোগে সম্ভাব্য প্রাণহানি এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে। শুধু খুলনাতেই প্রায় ৩১০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাক্কলন করা হয়েছে।

তবে এসব সংখ্যা নিশ্চিত প্রাণহানির হিসাব নয়। গবেষকেরা বিভিন্ন অঞ্চলের অতীতের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য অতিরিক্ত উষ্ণতার সঙ্গে মিলিয়ে এ হিসাব করেছেন। গবেষণাটি এখনো পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।

তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন বয়স্ক মানুষ, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং যাদের শীতল পরিবেশ বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত। গবেষকেরা তাপমাত্রার আগাম সতর্কতা, শীতলীকরণ কেন্দ্র, অতিরিক্ত চিকিৎসাকর্মী এবং বাইরে কর্মরত মানুষের সুরক্ষা জোরদারের মতো পদক্ষেপের কথা বলেছেন।

এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ‘ভেরি স্ট্রং’ বা ‘গডজিলা’ পর্যায়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে এর সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ডব্লিউএমওর সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০২৬ সময়ের পূর্বাভাসে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর প্রাক্কলন

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের বিশ্লেষণে আগামী ছয় মাসে এল নিনোর অতিরিক্ত গরমের কারণে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর প্রাক্কলন করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে প্রায় ১৩ হাজার ৩০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাক্কলন করা হয়েছে।

শুধু গরম নয়, বাড়তে পারে খরা-বন্যার ঝুঁকিও

এল নিনো শুধু তাপমাত্রা বাড়ায় না; এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনও বদলে যেতে পারে। কোনো অঞ্চলে খরা বাড়তে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে ভারি বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব কৃষি, পানি সরবরাহ ও খাদ্যনিরাপত্তায়ও পড়তে পারে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে তীব্র গরমের সঙ্গে বন্যা, অতিবৃষ্টি বা অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগ যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তবে কোনো অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব কতটা তীব্র হবে, তা শুধু এল নিনোর শক্তির ওপর নির্ভর করে না। ভৌগোলিক অবস্থান, ঋতু এবং ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগরের পরিস্থিতিসহ অন্যান্য জলবায়ুগত নিয়ামকও স্থানীয় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে।

মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের প্রভাবও রয়েছে

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তবে বর্তমান এল নিনো এমন একটি পৃথিবীতে ঘটছে, যেখানে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গড় তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেশি। ফলে এল নিনোর উষ্ণতার প্রভাবও আরও উষ্ণ পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অত্যন্ত গরম দিনের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে। গবেষকেরা এই পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের আরও উষ্ণ পৃথিবীর একটি সম্ভাব্য চিত্র হিসেবে দেখিয়েছেন।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে তাপজনিত ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নগরপরিকল্পনা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

১৯৪ বছরের কচ্ছপ জোনাথন: যার জিনে মিলল দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য সূত্র

বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। অথচ খাবারের প্রতি আগ্রহ কমেনি, জীবনযাপনও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনসহ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী অ্যালডাব্রা...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

ওষুধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় রসায়নে নোবেল পেলেন কাগান ও সোয়াই

২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান ও জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার প্রভাব ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের...
জাতীয়
0
minutes

দক্ষিণ মেরুর বরফে মহাবিশ্বের রহস্য খুঁজে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

মহাবিশ্বের গভীর থেকে পৃথিবীতে ছুটে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত এবং এ নিয়ে নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার...
জাতীয়
0
minutes

যে আবিষ্কারের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

লেখক: কাজী আকাশ, সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেওর্গ নাগেল। আলোর সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img