মহাবিশ্বের গভীর থেকে পৃথিবীতে ছুটে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত এবং এ নিয়ে নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ান বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। দক্ষিণ মেরুতে স্থাপিত আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগারে তার নেতৃত্ব ও দীর্ঘদিনের গবেষণার জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
৮২ বছর বয়সী হালজেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন–ম্যাডিসনের সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ মেরুর বরফে নিউট্রিনো শনাক্তের গবেষণায় তার কাজ শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা ও নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে তিনি নিউট্রিনোকে কাজে লাগিয়ে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেন।
নোবেল কমিটির মতে, হালজেনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেছে।
দক্ষিণ মেরুর বরফে বিশাল পর্যবেক্ষণাগার
আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগার দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে স্থাপিত একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক স্থাপনা। এর আয়তন প্রায় এক ঘনকিলোমিটার। বরফের গভীরে বসানো রয়েছে অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর। এসব সেন্সরের সাহায্যে মহাবিশ্ব থেকে পৃথিবীতে পৌঁছানো অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করা হয়।
নিউট্রিনো হলো অতিপারমাণবিক কণার একটি বিশেষ ধরন। এগুলো পদার্থের সঙ্গে খুব সামান্যই সংঘর্ষে জড়ায়। ফলে অন্য অনেক কণার তুলনায় নিউট্রিনো মহাকাশের বিপুল দূরত্ব অতিক্রম করে প্রায় বাধাহীনভাবে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই মহাবিশ্বের অত্যন্ত দূরবর্তী ও শক্তিশালী উৎস সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নিউট্রিনো বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আলো নয়, নিউট্রিনো দিয়ে মহাবিশ্ব দেখা
প্রচলিত জ্যোতির্বিজ্ঞানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন বস্তু ও ঘটনা পর্যবেক্ষণে আলো এবং অন্যান্য তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বকে জানার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ খুলে দিয়েছে।
আইসকিউবের মাধ্যমে মহাজাগতিক নিউট্রিনোর শক্তি ও উৎস নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের এক গবেষণায় আইসকিউবের তথ্য ব্যবহার করে ৫ টেরাইলেকট্রনভোল্ট থেকে ১০ পেটাইলেকট্রনভোল্ট শক্তির নিউট্রিনো বর্ণালিতে পরিবর্তনের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
এ ধরনের পর্যবেক্ষণ মহাজাগতিক রশ্মির উৎস এবং মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও স্পষ্ট করতে সহায়তা করছে।
নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য
স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এবারের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে। এ বছর প্রতিটি নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। কোনো পুরস্কার একাধিক বিজয়ীর মধ্যে ভাগ হলে নির্ধারিত অর্থ তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবার নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়। এরপর ঘোষণা করা হলো পদার্থবিজ্ঞানের পুরস্কার। পর্যায়ক্রমে রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারও পরে ঘোষণা করা হবে।
দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে স্থাপিত বিশাল পর্যবেক্ষণাগার থেকে মহাবিশ্বের অদৃশ্য এক বার্তা ধরার এই দীর্ঘ গবেষণা তাই শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের স্বীকৃতি নয়; মহাবিশ্বকে বোঝার পদ্ধতিতেও এটি যোগ করেছে নতুন এক জানালা।
সূত্র: এনডিটিভি






