৫ বছরে হারিয়ে গেছে ৫৭ গো-বক কলোনি, অস্তিত্ব সংকটে ফসল রক্ষাকারী গো-বক

গ্রামবাংলার মাঠঘাটে গবাদি পশুর সঙ্গে প্রায়ই দেখা মেলে সাদা গো-বকের। কখনো গরুর পিঠের পাশে, কখনো ধানক্ষেতের আল ধরে কিংবা জলাভূমির কিনারে ঘুরে বেড়ায় এ পাখি। গবাদি পশু ও কৃষিজমির আশপাশে থাকা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে এরা একদিকে কৃষকের উপকার করে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে।

এ কারণে গো-বককে বলা হয় কৃষকের বন্ধু। কিন্তু সেই উপকারী পাখিটিই এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রজনন কলোনি হারিয়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় কমছে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল। গত পাঁচ বছরে অন্তত ৫৭টি গো-বকের প্রজনন কলোনি ধ্বংস হয়ে গেছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব থ্রেটেন্ড ট্যাক্সা’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

গবেষণাটির শিরোনাম ‘নেস্টিং কলোনিজ অ্যান্ড ব্রিডিং ইকোলজি অব দ্য ক্যাটল ইগ্রেট বিউবুলকাস আইবিস (লিনিয়াস, ১৭৫৮) ইন নর্দার্ন অ্যান্ড নর্থইস্টার্ন বাংলাদেশ’। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান ও অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের দিকনির্দেশনায় এবং আল্লামা শিবলী সাদিকের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে আরও যুক্ত ছিলেন ফাহাদ হোসেন হায়দার ও এম শের-ই-আফগান।

ছয় বছরে ২১৮ কলোনির সন্ধান

২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ছয় বছর ধরে রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের ২৪টি জেলায় অনুসন্ধান চালান গবেষকেরা। বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান করে গো-বকের মোট ২১৮টি কলোনির স্থান চিহ্নিত করা হয়।

এর মধ্যে ১২৩টি বা ৫৬ দশমিক ৪২ শতাংশ স্থানে সক্রিয় প্রজনন কলোনি পাওয়া গেছে। আরও ৩৮টি স্থান বা ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ শুধু রাতে থাকার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব স্থানকে ‘নৈশ আবাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

অন্যদিকে, গত পাঁচ বছরে মানুষের অত্যাচার ও গাছ কাটার কারণে ৫৭টি বা ২৬ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রজনন কলোনি ধ্বংস হয়ে গেছে।

রাজশাহী ও সিলেটে বেশি

গো-বকের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় প্রজনন কলোনি পাওয়া গেছে রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে। দুটি বিভাগেই ৪১টি করে সক্রিয় কলোনি রয়েছে। রংপুর বিভাগে ২১টি এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ২০টি সক্রিয় কলোনি পাওয়া গেছে।

জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ২৫টি প্রজনন স্থান পাওয়া গেছে নওগাঁয়। বিপরীতে পাবনা, লালমনিরহাট ও জামালপুরে মাত্র একটি করে কলোনি অবশিষ্ট রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধায় কোনো সক্রিয় প্রজনন কলোনির অস্তিত্ব খুঁজে পাননি গবেষকেরা।

ধানক্ষেতের পাশেই বেশি বাসা

গো-বক প্রজনন ও বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের পরিবেশকে বেশি পছন্দ করে। গবেষণায় দেশের ১২৩টি সক্রিয় কলোনিতে মোট ২৯ হাজার ৪১২টি সক্রিয় বাসা গণনা করা হয়েছে।

এর মধ্যে ২২ হাজার ৭৯৫টি বা ৭৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বাসা ধানক্ষেতের সংলগ্ন গাছ বা বাঁশঝাড়ে তৈরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া জলাভূমির কাছাকাছি এলাকায় ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ, মিশ্র কৃষি অঞ্চলে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ, চা বাগানে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আমবাগানে ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং বসতবাড়ির আশপাশে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ বাসা পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ, কৃষিজমি ও জলাভূমির কাছাকাছি গাছপালা গো-বকের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

গাছ কাটায় হারাচ্ছে কলোনি

গবেষণায় গো-বকের কলোনি ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গাছ ও বাঁশঝাড় কেটে ফেলা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া কলোনিগুলোর ৬৬ শতাংশের ক্ষেত্রে বড় গাছ বা বাঁশঝাড় কেটে ফেলা হয়েছিল।

এ ছাড়া ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের উপদ্রব, বাসা থেকে ডিম ও ছানা চুরি, পাখির ওপর গুলি চালানো কিংবা বিষ প্রয়োগের মতো ঘটনা পাখিগুলোকে কলোনি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে।

ফলে শুধু পাখি নয়, তাদের দীর্ঘদিনের প্রজননস্থলও হারিয়ে যাচ্ছে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতেই অধিকাংশ কলোনি

গো-বকের বড় সক্রিয় কলোনিগুলোর প্রায় ৯৯ শতাংশই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে অবস্থিত। গবেষণায় এসব কলোনির আওতাধীন প্রায় ১০৫ দশমিক ৯৬ হেক্টর জমির মালিকানা ব্যক্তির বলে উঠে এসেছে।

তবে গো-বকের বড় কলোনির পাশে বসবাস করা মানুষের জন্য এ পাখি সবসময় স্বস্তিদায়ক নয়। প্রজনন মৌসুমে হাজার হাজার পাখি একসঙ্গে অবস্থান করায় দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। পাখির বিষ্ঠার কারণে টিনের চালে জং ধরে নষ্ট হতে পারে। এমনকি পুকুরে মাছ চাষেও সমস্যা তৈরি হয়।

তারপরও স্থানীয় অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এসব পাখিকে সহ্য করে আসছেন। কোনো কোনো এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরোনো কলোনিও রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাখি

গবেষণা দলের প্রধান ও বন অধিদপ্তরের গবেষক আল্লামা শিবলী সাদিক বলেন, গো-বক কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতিকর পোকা দমন এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাঁর মতে, যেসব গাছ বা বাঁশঝাড়ে গো-বকের কলোনি রয়েছে, সেসব জমি বা বাড়ির মালিককে সামান্য বার্ষিক ক্ষতিপূরণ কিংবা প্রণোদনা দেওয়া হলে পাখি সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। এতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ পাখিগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান বলেন, গো-বকের প্রজনন কলোনিগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায়। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার কারণেই অনেক কলোনি এখনো টিকে আছে।

কীভাবে বাঁচানো যাবে গো-বক?

গো-বক সংরক্ষণে কয়েকটি সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে কলোনি রক্ষাকারী জমি বা বাড়ির মালিকদের বার্ষিক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা প্রণোদনা দেওয়া।

প্রজনন মৌসুমে গো-বক শিকার, ডিম বা ছানা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রজনন মৌসুমে চিহ্নিত কলোনির আশপাশের প্রজনন গাছ ও বাঁশঝাড় কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে ‘কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয়’ গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।

গো-বক হয়তো গ্রামের মানুষের চোখে খুব পরিচিত একটি সাধারণ পাখি। কিন্তু ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে কৃষিতে অবদান রাখা এই পাখির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে তার প্রজননস্থল রক্ষা করা জরুরি।

কারণ, একটি গো-বক কলোনি শুধু কয়েকটি পাখির আশ্রয় নয়, এটি বহু প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল। সেই কলোনি একবার হারিয়ে গেলে সেখানে আবার পাখির ফিরে আসা কতটা সম্ভব, সেটিও অনিশ্চিত।

তাই কৃষকের এই নীরব সহচরকে বাঁচাতে হলে এখনই রক্ষা করতে হবে তার গাছ, বাঁশঝাড় ও প্রজননস্থল।

সূত্র: কালবেলা

আরও পড়ুন

গারো পাহাড়ে আটকা ১৩৫ হাতি, করিডর চালুর পরিকল্পনা পরিবেশমন্ত্রীর

মেঘালয় থেকে আসা প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৫টি বন্যহাতি সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কারণে নিজ দেশে ফিরতে পারছে না বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

মানববর্জ্য ও কৃষিজ বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল, প্রকল্পে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

মানববর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের একটি উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রদর্শনী দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয়...
জাতীয়
0
minutes

বাঁশবাড়ি কলোনির উদ্যোগে মুগ্ধ প্রধানমন্ত্রী, দেখতে গেলেন পরিবেশমন্ত্রী

ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনির সড়কে একসময় ছিল আবর্জনার দুর্গন্ধ। এখন সেই সড়কের দুই পাশের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নানা প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহারের গাছ। অব্যবহৃত...
জাতীয়
0
minutes

অদ্ভুত বন্ধন: হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে অ্যামাজনকে পুষ্টি জোগায় সাহারা

একদিকে পৃথিবীর বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি সাহারা, অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অ্যামাজন বৃষ্টিঅরণ্য। ভৌগোলিকভাবে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুই অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img