শুষ্ক মৌসুমে কোনো ডোবা কাদায় শুকিয়ে চৌচির। অথচ সেই শুকনো মাটির নিচে হাত দিলেই মাঝেমধ্যে উঠে আসে জ্যান্ত একটি মাছ, শিং মাছ। পানিহীন মাটির নিচে মাসের পর মাস থেকেও কীভাবে বেঁচে থাকে এই মাছ?
এর রহস্য লুকিয়ে আছে তার শরীরের বিশেষ কিছু অভিযোজনের মধ্যে।
শিং মাছের মাথার পেছন থেকে লেজের দিকে একটি লম্বা নলাকার বায়ুথলি রয়েছে, যাকে বলা হয় রেসপিরেটরি স্যাক। বেশির ভাগ মাছ ফুলকার মাধ্যমে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন নেয়। কিন্তু শিং মাছ এই বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে সরাসরি বাতাস থেকেও অক্সিজেন নিতে পারে। ফলে পানিতে অক্সিজেন কমে গেলেও তার বেঁচে থাকতে তুলনামূলক সুবিধা হয়।
কাদার নিচে গ্রীষ্মনিদ্রা
গ্রীষ্মের শুরুতে বাংলাদেশের ছোট খাল-বিল ও ডোবা শুকাতে থাকে। তখন শিং মাছ কাদার নিচে গর্ত করে সেঁধিয়ে যায়। কখনো প্রায় এক হাত গভীরেও চলে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে বলেন এস্টিভেশন বা গ্রীষ্মনিদ্রা। এ সময় মাছটির শরীরের কার্যক্রম অনেকটা ধীর হয়ে আসে। বিপাক কমে যায়, হৃৎস্পন্দনও ধীর হয়। খাবার ছাড়াই শরীরে জমা শক্তি ব্যবহার করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ এভাবে টিকে থাকতে পারে। প্রথম বৃষ্টি ও জলাশয়ে পানি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
শরীরেও আছে পানি বাঁচানোর কৌশল
শিং মাছের গায়ে থাকা পুরু মিউকাসের আস্তরণ শুকনো পরিবেশেও শরীরের জলীয় অংশ ধরে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন পানির অপচয় কমায় এবং দীর্ঘ সময় খাদ্য ও পানির সংকট সহ্য করতে সাহায্য করে।
এই অভিযোজনগুলোই শুকনো কাদার নিচে তার টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি।
পানি ছাড়াই চলতে পারে
শিং মাছের আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, পানি ছাড়া মাটির ওপরও এটি একধরনের ‘হাঁটতে’ পারে। বুকের পাখনা মাটিতে গেঁথে শরীর বাঁকিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগোয়। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা মাঠ ধরে এভাবেই একটি শুকনো ডোবা থেকে অন্য জলাশয়ে পৌঁছাতে পারে মাছটি। এ কারণেই গ্রামাঞ্চলে একে অনেক সময় ‘হাঁটা মাছ’ বলা হয়।
তবে এই মাছ ধরতে সাবধান থাকতে হয়। শিং মাছের পাখনার গোড়ায় শক্ত কাঁটা থাকে, যার খোঁচায় বেশ কিছু সময় ব্যথা ও জ্বালা করতে পারে। শিকারি প্রাণীর বিরুদ্ধেও এটি মাছটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ অভিযোজন
দক্ষিণ এশিয়ার নদী-নালায় বর্ষায় প্রচুর পানি আর শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, এই চক্র বহু দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে। এমন পরিবেশে টিকে থাকতে শিং মাছের মতো কিছু প্রজাতি শরীরে তৈরি করেছে বিশেষ অভিযোজন।
মাগুর মাছেরও বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার অনুরূপ শ্বাসযন্ত্র রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য দেখায়, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রাণীরা কীভাবে নিজেদের শরীর ও আচরণে পরিবর্তন এনেছে।
ভবিষ্যৎ গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা
জমি চাষের সময় মাটির নিচ থেকে জ্যান্ত শিং মাছ বেরিয়ে আসা গ্রামবাংলার মানুষের কাছে বহুদিনের পরিচিত দৃশ্য। বিজ্ঞানীরা পরে এর পেছনের শারীরবৃত্তীয় কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন সহনশীল প্রজাতির অভিযোজন নতুন করে গবেষণার বিষয় হয়ে উঠছে। শিং মাছের দেহের প্রোটিন, এনজাইম ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা ভবিষ্যতে প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণীর টিকে থাকার কৌশল বুঝতে নতুন তথ্য দিতে পারে।
আপাতত খরার দিনে শুকিয়ে যাওয়া ডোবার কাদার নিচে নীরবে অপেক্ষা করে শিং মাছ। বাইরে থেকে মৃত মনে হওয়া সেই মাটির নিচেই বেঁচে থাকে এক আশ্চর্য জীবনীশক্তি, পরের বৃষ্টির অপেক্ষায়।
সূত্র: বিজ্ঞান চিন্তা






