ডাইনোসর থেকে বাদুড়, বাদুড়ের বিবর্তনের ৬ কোটি বছরের রহস্য উন্মোচন

রাতের অন্ধকারে হঠাৎ ডানা মেলে উড়ে গেল একটি বাদুড়। চোখে হয়তো চারপাশের কিছুই স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার চলার পথে বাধা নেই। শব্দ ছুড়ে দিয়ে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি শুনেই সে বুঝে নেয় সামনে কী আছে, কোথায় যেতে হবে, কোথায় লুকিয়ে আছে শিকার।

হাজার হাজার বছর ধরে রাতের আকাশে এমনই এক রহস্যময় জীবন কাটিয়ে আসছে বাদুড়। কিন্তু এই উড়ুক্কু স্তন্যপায়ী প্রাণীর শুরুটা কোথায়? কখন পৃথিবীর আকাশে প্রথম ডানা মেলেছিল তারা?

এতদিন এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর বিজ্ঞানীদের কাছেও পরিষ্কার ছিল না। এবার বাদুড়ের জিনগত তথ্য ও জীবাশ্ম নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যৌথ গবেষণায় সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের উত্তর মিলেছে।

গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে ইউরোপে প্রথম বাদুড়ের আবির্ভাব ঘটেছিল। অর্থাৎ, ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ গণবিলুপ্তির মাত্র কয়েক লাখ থেকে প্রায় ১০ লাখ বছরের মধ্যেই এই উড়ুক্কু স্তন্যপায়ী প্রাণীর উদ্ভব হতে পারে।

এরপর ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে বাদুড়।

এর আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার কোনো অঞ্চলে প্রথম বাদুড়ের উৎপত্তি হয়েছিল।

জিনোম ও জীবাশ্মে মিলল বিবর্তনের সূত্র

গবেষণায় ২১টি স্বীকৃত পরিবারের ১০৩টি প্রজাতির বাদুড়ের উচ্চমানের জিনোমের তথ্য একত্র করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ৪৪টি বাদুড়ের জীবাশ্ম।

এই বিপুল তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে গবেষকেরা বাদুড়ের বিবর্তনীয় ইতিহাস অনুসরণ এবং তাদের একটি বিস্তৃত বংশতালিকা তৈরির চেষ্টা করেছেন।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘নেচার’-এ।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, শুধু উড়তে পারার ক্ষমতাই নয়, অন্ধকারে পথ চলা ও শিকার ধরার জন্য বাদুড়ের ইকোলোকেশন বা প্রতিধ্বনিনির্ভর অবস্থান শনাক্ত করার ক্ষমতাও বিবর্তনের একেবারে শুরুর দিকেই বিকশিত হয়েছিল।

একসঙ্গে দুই ক্ষমতা, খুলে গেল রাতের দরজা

স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক সোনজা ভার্নেস বলেন, উড়তে পারা ও ইকোলোকেশন, দুটি ক্ষমতাই বাদুড়কে নতুন পরিবেশে প্রবেশের বড় সুযোগ করে দিয়েছিল।

তার মতে, রাতে প্রতিযোগী ও শিকারি তুলনামূলক কম থাকায় তখন শিকার করা সহজ হতে পারে। উড়ার ক্ষমতা বাদুড়কে আকাশে নিয়ে গেছে, আর ইকোলোকেশন তাদের রাতের জগৎ দখলের সুযোগ দিয়েছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ও গবেষণার আরেক প্রধান গবেষক এমা টিলিং বলেন, ইকোলোকেশন বাদুড়কে নিশাচর হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। ফলে দিনের বেলায় সক্রিয় পাখিদের সঙ্গে খাবারের প্রতিযোগিতা এড়ানোর পাশাপাশি তাদের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও কমেছে।

গ্রহাণুর আঘাত, তারপর বাদুড়

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে আঘাত হানে একটি বিশাল গ্রহাণু। এর পরই ডাইনোসরসহ পৃথিবীর বহু প্রাণীগোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ওই মহাবিপর্যয়ের প্রায় ১০ লাখ বছর পর ইউরোপে প্রথম বাদুড়ের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

গ্রহাণুর আঘাতের ফলে পৃথিবীর জীবজগতের পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। অনেক প্রাণীগোষ্ঠী হারিয়ে যাওয়ায় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য নতুন পরিবেশগত সুযোগ তৈরি হয়। একপর্যায়ে পৃথিবীর স্থলভাগে স্তন্যপায়ীদের বিস্তার দ্রুত বাড়তে থাকে।

নিউইয়র্ক স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টনি ব্রুক ক্যাম্পাসের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী লিলিয়ানা দাভালোস বলেন, ইউরোপের পর বাদুড় আফ্রিকায় পৌঁছে যায়। ফলে দুটি মহাদেশই আদিম বাদুড়ের বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আজ অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই বাদুড়ের বসতি রয়েছে। পৃথিবীর মোট স্তন্যপায়ী প্রজাতির পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি বাদুড়।

বাদুড়ের বয়স আসলে কত?

এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো বাদুড়ের জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বছর। কিন্তু জিনোম ও শারীরিক গঠনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বাদুড়ের উৎপত্তি আরও প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের বলে ধারণা করছেন।

এখানেই তৈরি হয়েছে আরেক রহস্য। বাদুড়ের পূর্বপুরুষ দেখতে কেমন ছিল? গাছের প্রাণী থেকে কী আকাশের বাসিন্দা?

পাখি ও বিলুপ্ত টেরোসরদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামোয় তৈরি বাদুড়ের ডানা। তাদের সামনের পা রূপান্তরিত হয়ে তৈরি হয়েছে ডানা, আর দীর্ঘ আঙুলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বড় চর্মঝিল্লি।

তবে প্রথম বাদুড়ের পূর্বপুরুষের চেহারা এখনো অজানা।

অধ্যাপক এমা টিলিংয়ের ধারণা, তারা হয়তো গাছে বসবাসকারী শ্রু-জাতীয় ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো দেখতে ছিল। সময়ের সঙ্গে তাদের আঙুল দীর্ঘ হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে সেই অঙ্গই ডানা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

তবে এটিকে তিনি অনুমান হিসেবেই দেখছেন। কারণ এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীন বাদুড়ের জীবাশ্মগুলো আধুনিক বাদুড়ের সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।

আগে উড়তে শিখেছিল, নাকি শব্দ শুনতে?

বাদুড়ের বিবর্তনের আরেক বড় রহস্য এখনো অমীমাংসিত, উড়ার ক্ষমতা আগে এসেছিল, নাকি ইকোলোকেশন?

বাদুড় উচ্চ কম্পাঙ্কের অতিশব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ সামনে থাকা বস্তুতে আঘাত করে ফিরে এলে তার প্রতিধ্বনি শুনে আশপাশের পরিবেশের একটি ধারণাগত মানচিত্র তৈরি করে তারা।

জীবাশ্মের কানের ভেতরের গঠন এবং শব্দ শোনার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখে প্রাচীন বাদুড়ের ইকোলোকেশনের সক্ষমতার প্রমাণ খোঁজা হয়।

কিন্তু সবচেয়ে পুরোনো বাদুড়ের জীবাশ্মেই উড়ার ও ইকোলোকেশনের উভয় বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। ফলে কোনটি আগে বিকশিত হয়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

এমা টিলিংয়ের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও পুরোনো ‘প্রাক-বাদুড়’ বা রূপান্তরকালীন জীবাশ্ম খুঁজে বের করতে হবে।

রাতের প্রাণী, অথচ গবেষণায় মানুষের ভবিষ্যৎ

বাদুড় শুধু উড়তে বা অন্ধকারে শিকার ধরতেই পারদর্শী নয়। অনেক প্রজাতির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অসাধারণ এবং নিজেদের আকারের তুলনায় তারা দীর্ঘ জীবনও পায়।

তাই বাদুড়ের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা মানুষের বার্ধক্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নতুন পথ দেখাতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

সবচেয়ে বড় থেকে সবচেয়ে ছোট

পৃথিবীতে এখন দেড় হাজারেরও বেশি প্রজাতির বাদুড় রয়েছে। তাদের আকার, চেহারা, খাবার ও জীবনযাপনেও রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য।

ফিলিপাইনের জায়ান্ট গোল্ডেন-ক্রাউন ফ্লাইং ফক্স সবচেয়ে বড় বাদুড়গুলোর একটি। ডানা মেললে এর বিস্তার সাড়ে পাঁচ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যদিকে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের বাম্বি বাদুড়ের ডানার বিস্তার প্রায় পাঁচ ইঞ্চি।

অধিকাংশ বাদুড় পোকামাকড় খায়। কিছু প্রজাতি ফল, ফুলের মধু বা মাছ খায়। আবার ভ্যাম্পায়ার শ্রেণির বাদুড় রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে।

ঘোড়াশাল বাদুড়, পাতা-নাকওয়ালা বাদুড়, ইঁদুর-লেজওয়ালা বাদুড়, ত্রিশূল বাদুড়, ভূত-মুখো বাদুড়, মোচওয়ালা বাদুড়, চোষক-পায়ের বাদুড়, হাতুড়ি-মাথা বাদুড় ও কুঁচকানো-মুখো বাদুড়, নানা বৈশিষ্ট্যের এসব প্রজাতি একই সঙ্গে বাদুড়ের বিস্ময়কর বিবর্তনের গল্প বলে।

ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর পৃথিবী যখন নতুন করে বদলে যাচ্ছিল, তখনই হয়তো কোনো এক অন্ধকার রাতে প্রথম বাদুড় ডানা মেলেছিল ইউরোপের আকাশে। সেই উড়ালই পরবর্তী কোটি কোটি বছরে ছড়িয়ে দিয়েছে এক বিস্ময়কর প্রাণীগোষ্ঠীকে পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, বাদুড় এখনো তাদের প্রতিনিয়ত অবাক করে- বিবর্তনের অন্যতম চমকপ্রদ পরীক্ষাগার হয়ে।

আরও পড়ুন

১৯৪ বছরের কচ্ছপ জোনাথন: যার জিনে মিলল দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য সূত্র

বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। অথচ খাবারের প্রতি আগ্রহ কমেনি, জীবনযাপনও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনসহ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী অ্যালডাব্রা...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

প্লাস্টিক বর্জ্য ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা বাড়াবে ইউএনডিপি

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিকস। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর)...
জাতীয়
0
minutes

ওষুধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় রসায়নে নোবেল পেলেন কাগান ও সোয়াই

২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান ও জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার প্রভাব ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের...
জাতীয়
0
minutes

লালবাগে ১৩ বাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, জরিমানা ১০ হাজার ৯০০ টাকা

রাজধানীর লালবাগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মোবাইল কোর্ট অভিযানে অতিরিক্ত গ্যাসীয় নিঃসরণ ও হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারের দায়ে ছয়টি মামলায় মোট ১০ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায়...
জাতীয়
0
minutes
spot_imgspot_img