মানুষের চেয়ে ৩০ গুণ বড় জিনোম, প্রকৃতির জিনগত রহস্যের জীবন্ত উদাহরণ এই মাছ

একটি মাছের জিনোম মানুষের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বড়, শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও এমনই এক বিস্ময় লুকিয়ে আছে দক্ষিণ আমেরিকার এক আশ্চর্য ফুসফুসধারী মাছে। নাম তার লেপিডোসিরেন প্যারাডক্সা। ২০২৪ সালে বিজ্ঞানীরা মাছটির সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে এর জিনগত গঠনের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য সামনে আনেন, যা প্রকৃতির জটিলতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

এই মাছের দেহে থাকা ডিএনএতে রয়েছে প্রায় ৯১ বিলিয়ন বেস। সহজভাবে বললে, ডিএনএর প্রায় ৯১ বিলিয়ন রাসায়নিক অক্ষর। অথচ মানুষের জিনোমে রয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন বেস। অর্থাৎ মানুষের তুলনায় এই মাছের জিনোম প্রায় ৩০ গুণ বড়।

কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ নয়।

এত বিশাল জিনোম থাকা সত্ত্বেও মাছটির জিনের সংখ্যা মানুষের তুলনায় খুব বেশি নয়। এতে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার জিন, যা মানুষের জিনের সংখ্যার কাছাকাছি।

তাহলে এত বিপুল ডিএনএ দিয়ে কী হচ্ছে?

বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশাল জিনোমের বড় একটি অংশই হলো এমন ডিএনএ, যা সরাসরি প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয় না। একে বলা হয় অ-কোডিং ডিএনএ। একসময় এ ধরনের ডিএনএর অনেক অংশকে ‘অপ্রয়োজনীয় ডিএনএ’ হিসেবে দেখা হতো। তবে বিজ্ঞান এখন বলছে, এর সবটাই যে অকেজো, এমন ধারণা ঠিক নয়। এর কিছু অংশ জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, অন্য প্রজাতির ফুসফুসধারী মাছের জিনোমের সঙ্গে তুলনা করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, লেপিডোসিরেন প্যারাডক্সার জিনোম যেন অত্যন্ত ধীর গতিতে বছরের পর বছর নিজের ডিএনএর ভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক কোটি বছরে এই মাছের জিনোমে মানুষের একটি সম্পূর্ণ জিনোমের সমপরিমাণ ডিএনএ যুক্ত হচ্ছে।

অর্থাৎ, জিনগত দিক থেকে বড় হওয়া মানেই বেশি জিন থাকা নয়। আবার বেশি ডিএনএ থাকলেই কোনো প্রাণী মানুষের চেয়ে বেশি জটিল, এমন ধারণাও সঠিক নয়। একটি প্রাণীর জিনোম অবিশ্বাস্য রকম বড় হতে পারে, অথচ তার জিনের সংখ্যা মানুষের কাছাকাছিই থাকতে পারে।

এই অদ্ভুত মাছটি তাই জীবনের জিনগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে, প্রকৃতি আসলে ডিএনএর এত বিশাল ভাণ্ডার কেন তৈরি করে?

বিজ্ঞানীরা এর কিছু উত্তর খুঁজে পেলেও জিনোমের এই বিশালত্বের পুরো রহস্য এখনো অমীমাংসিত। প্রকৃতি তার জিনগত রহস্যের কতটা আমাদের সামনে খুলে ধরেছে, আর কতটাই বা এখনো অজানা, সম্ভবত সেটিই এই মাছকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

সূত্র: দর্পণ

আরও পড়ুন

১৯৪ বছরের কচ্ছপ জোনাথন: যার জিনে মিলল দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য সূত্র

বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। অথচ খাবারের প্রতি আগ্রহ কমেনি, জীবনযাপনও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনসহ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী অ্যালডাব্রা...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

ওষুধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় রসায়নে নোবেল পেলেন কাগান ও সোয়াই

২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান ও জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার প্রভাব ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের...
জাতীয়
0
minutes

দক্ষিণ মেরুর বরফে মহাবিশ্বের রহস্য খুঁজে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

মহাবিশ্বের গভীর থেকে পৃথিবীতে ছুটে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত এবং এ নিয়ে নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার...
জাতীয়
0
minutes

যে আবিষ্কারের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

লেখক: কাজী আকাশ, সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেওর্গ নাগেল। আলোর সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img