পাখি মানেই আকাশে উড়ে বেড়ানো। কিন্তু এমন একটি পাখি আছে, যে আকাশের পাশাপাশি পানির গভীরেও ডানা মেলে ছুটে বেড়াতে পারে। নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্রের পানিতে হঠাৎ ডুব দিয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চোখের আড়ালে চলে যায় সে। এরপর পানির নিচে ডানা ও পায়ের সাহায্যে দ্রুত এগিয়ে শিকার ধরে আবার ভেসে ওঠে। এই অসাধারণ জলচর পাখিই পানকৌড়ি।
পানকৌড়ি ফ্যালাক্রোকোরাসিডি গোত্রের ফ্যালাক্রোকোরাক্স গণের অন্তর্ভুক্ত একদল জলচর পাখি। ইংরেজিতে এরা কর্মোরেন্ট ও শ্যাগ নামে পরিচিত। সারা পৃথিবীতে পানকৌড়ির প্রায় ৪০টি প্রজাতি রয়েছে। এদের শরীরে সাধারণত কালো বর্ণের প্রাধান্য দেখা যায়।
পানকৌড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো পানির নিচে শিকার করার দক্ষতা। মাছের সন্ধানে এরা পানির বেশ গভীরে ডুব দিতে পারে। পানিতে ঢোকার পর ডানা ও পা ব্যবহার করে এমনভাবে এগিয়ে চলে, যেন পানির নিচে উড়ছে। দ্রুত সাঁতার কেটে মাছের পিছু নেয় এবং সুযোগ বুঝে শিকার ধরে ফেলে।
জলের ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, পাখিটি শুধু ডুব দিয়ে আবার ভেসে উঠছে। কিন্তু পানির নিচে তার চলাফেরা বেশ সক্রিয়। শরীরের গঠন ও সাঁতারের দক্ষতার কারণে পানকৌড়ি জলজ পরিবেশে অত্যন্ত কার্যকর শিকারি। মাছই তাদের প্রধান খাদ্য হলেও জলজ পরিবেশ অনুযায়ী অন্যান্য ছোট জলজ প্রাণীও তাদের খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে।
পানকৌড়ির বসবাসও পানির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল, হ্রদ, নদী ও বিভিন্ন জলাশয়ে এদের দেখা যায়। কোথাও ঝোপঝাড়ে, কোথাও গাছের ডালে, আবার কোথাও সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ের খাঁজে তারা বাসা তৈরি করে।
বাসা তৈরিতেও পানকৌড়ির রয়েছে নিজস্ব কৌশল। ডালপালা, সামুদ্রিক আগাছা ও গুয়ানো বা পাখির বিষ্ঠা ব্যবহার করে তারা বাসা তৈরি করে। এই গুয়ানো শুধু বাসা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় না; সার হিসেবেও এর বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে।
প্রজননের সময় পানকৌড়ি ডিম পাড়ে। নতুন ডিমের রং নীলচে হলেও সময়ের সঙ্গে তা চকচকে সাদা হয়ে যায়। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। এরপর অভিভাবক পাখির যত্নে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে ছানারা। প্রায় তিন বছর বয়সে তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।
পানকৌড়িকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের আরেকটি বিষয় হলো তাদের শ্রেণিবিন্যাস। এই পাখিদের শ্রেণিবিন্যাসে বর্গ, গোত্র ও গণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মতভেদ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের শ্রেণিবিন্যাস আরও নির্দিষ্ট করতে বেশ কয়েকটি নতুন গণের নামও প্রস্তাব করা হয়েছে।
আকাশে পাখির উড়াল আমাদের কাছে স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু পানকৌড়ির বিশেষত্ব হলো, পানিতে ডুব দেওয়ার পরও তার চলাফেরায় যেন উড়ালের ছন্দ দেখা যায়। ডানা মেলে পানির নিচে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মাছের পিছু নেওয়া এই পাখি তাই জলজ প্রকৃতির এক বিস্ময়কর শিকারি।
নদী বা হ্রদের শান্ত পানিতে হঠাৎ একটি পানকৌড়ি ডুব দিলে তার পরের দৃশ্যটি চোখে পড়ে না। কয়েক মুহূর্ত পর যখন দূরে গিয়ে তার কালো মাথা পানির ওপর ভেসে ওঠে, তখন বোঝা যায়, এই সময়টুকুতে সে পানির নিচে নিছক সাঁতার কাটেনি; শিকারের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছে জলের গভীরে।






