সৌরবিদ্যুতের প্রসার, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, খাল খনন ও পুনরুদ্ধার এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জলবায়ু অগ্রাধিকার এবং কপ-৩১ সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রচার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সভাটির আয়োজন করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো সরকারের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কার্যক্রমের অন্যতম অগ্রাধিকার। আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পাশাপাশি উপযুক্ত স্থানে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এতে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে।
সৌরবিদ্যুতের প্রসারে মানসম্মত প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
দূষণকারী ইটভাটা বন্ধে জোর
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটা বন্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশগত বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। ইট উৎপাদনে দূষণ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্লক ও বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে সরকার।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ মোকাবিলায় শুধু ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করলেই চলবে না। নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের নির্গমন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
২৫ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুফলে রূপ দিতে উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বনভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল, সড়কের পাশ এবং উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিসরে বৃক্ষরোপণ এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না; গাছের পরিচর্যা, সুরক্ষা এবং বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তরুণ সমাজ ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততার ঝুঁকি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পানিসম্পদ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের অভিযোজন কার্যক্রমে দুর্যোগ প্রস্তুতি, আগাম সতর্কীকরণ, উপকূলীয় সুরক্ষা, বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় চাহিদা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কার্বন ক্রেডিট কাঠামো নিয়ে কাজ করছে সরকার
কার্বন ক্রেডিট কাঠামো প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো ও বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণের উদ্যোগে বিনিয়োগ আকর্ষণে এ কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ জন্য প্রকল্প অনুমোদন, নির্গমন হ্রাসের পরিমাপ, প্রতিবেদন তৈরি, স্বাধীন যাচাই এবং একই নির্গমন হ্রাসের হিসাব একাধিকবার গণনা ঠেকানোর সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ লক্ষ্যেই সরকার কার্বন ক্রেডিট কাঠামো নিয়ে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন বাজারে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপের অংশীদারদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কপ-৩১ সামনে রেখে বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের চাহিদা ও জলবায়ু অর্থায়নের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে বাস্তবায়নযোগ্য কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে, যাতে মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষায় দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যায়।
মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমের সভাপতিত্বে সভায় অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফার্স্ট কাউন্সেলর ও গ্রিন ইকোনমি অ্যান্ড পাবলিক সেক্টর ইনভেস্টমেন্টস বিভাগের প্রধান টোবিয়াস বিয়ারমান, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশ ও জ্বালানিবিষয়ক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তানজিনা দিলশাদ, ঢাকায় জার্মান দূতাবাসের কাউন্সেলর ও জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান উলরিখ ক্লেপমান, ডেনমার্ক দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন অ্যান্ডার্স বি. কার্লসেন ও প্রতিনিধি আলবার্টে ফ্যাক্সহোল্ম এবং ফ্রান্স দূতাবাসের সেকেন্ড কাউন্সেলর ক্রিশ্চিয়ান বেক উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।






