সুন্দরবনে নতুন ৫ প্রজাতির মাছ ও ২ প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সুন্দরবন। তবে বনের জীববৈচিত্র্য শুধু স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ নয়, পানির নিচেও রয়েছে সমৃদ্ধ এক জগৎ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুন্দরবনের জলভাগে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। একই সঙ্গে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র, গত দেড় দশকে বনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সরকারের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ১৬ মাস ধরে গবেষণাটি পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণার খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আগের বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে নতুন জরিপের তথ্য মিলিয়ে সুন্দরবনে মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক ও স্কুইড।

ডিএনএ বিশ্লেষণে নতুন প্রজাতির সন্ধান

গবেষকেরা ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খাল জরিপ করেন। এ ছাড়া বনের ভেতরে ৪২৪ কিলোমিটার নৌপথে জরিপ এবং শ্যামনগর, কয়রা, মোংলা ও শরণখোলার সাতটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সুন্দরবনের ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর ডিএনএ বারকোড তৈরি করেন গবেষকেরা। ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য নতুন পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি শনাক্ত করা হয়।

নতুন শনাক্ত মাছগুলো হলো বড় আইশ পারশে (Planiliza macrolepis), ফোটা বাটা (Crenimugil seheli), বার্মিজ এক ঠুইটা (Dermogenys burmanica), কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে (Butis humeralis) এবং ফোটা বেলে (Acentrogobius viridipunctatus)।

নতুন শনাক্ত দুই প্রজাতির চিংড়ির বৈজ্ঞানিক নাম Cloridos scorpio ও Nematopalaemon tenuipes। গবেষকদের ভাষ্য, স্থানীয় জেলেরা এসব চিংড়িকে সাধারণ ছোট নদীর চর চিংড়ির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতেন। ফলে এত দিন এগুলোর পৃথক আঞ্চলিক নাম গড়ে ওঠেনি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তিনটি মাছ ও একটি কাঁকড়ার ডিএনএ বিন্যাস আন্তর্জাতিক জিনব্যাংকের তথ্যভান্ডারে আগে ছিল না। সেগুলো প্রথমবারের মতো জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

কমছে বড় মাছের উৎপাদন

নতুন প্রজাতির সন্ধান মিললেও সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, গত দেড় দশকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় আকারের সাদা মাছের উৎপাদন অর্ধেকের বেশি কমেছে। আইড়, ভেটকি, ভোল ও পাঙাশের মতো মাছের আহরণ কমছে। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম দামের ছোট মাছ বেশি ধরা পড়ছে।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৩৬০ টন মাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৭০ টনে।

একইভাবে, সাতক্ষীরা রেঞ্জে ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৭৯৭ টন মাছ সংগ্রহ করা হলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০ টনে।

গবেষণায় ভেটকি, পোয়া ও পাঙাশের মতো জনপ্রিয় মাছ এবং বাগদা চিংড়িকে অতিরিক্ত আহরণের ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিষ ও ক্ষতিকর জালে বিপন্ন জলজ সম্পদ

গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, সুন্দরবনের উপকূলীয় জলভাগ মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের জলজ সম্পদ আরও বাড়ানো সম্ভব।

তিনি বলেন, ছোট মাছ ও পোনা অবস্থাতেই অনেক মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। বিষ প্রয়োগের কারণে অনেক প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ভেটকি, পোয়া, কাইন মাগুর ও শিলা কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির আহরণের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি মাছ আহরণের নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পুনর্বিবেচনা, ক্ষতিকর জাল ও বিষ প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, পারশে, নোনা ট্যাংরা ও দাঁতিনার পোনা হ্যাচারিতে উৎপাদন এবং বননির্ভরশীল মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।

৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণী

সুন্দরবনের জলভাগে ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৭ প্রজাতির চিংড়ি, ২৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ১৬ প্রজাতির শামুক, ১৫ প্রজাতির ঝিনুক, পাঁচ প্রজাতির অক্টোপাস ও স্কুইড এবং এক প্রজাতির বার্নাকল ও এক প্রজাতির কাইটন।

১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রথম জরিপে সুন্দরবনে ১৭৫ প্রজাতির মাছ শনাক্ত করেছিল। পরবর্তী তিন দশকে বিভিন্ন গবেষণায় আরও প্রজাতির উপস্থিতি উঠে এসেছে। নতুন গবেষণায় শুধু জরিপ করা এলাকাতেই ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে। আগের গবেষণার তথ্যসহ সুন্দরবনে মাছের প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮২ এবং খোলসযুক্ত প্রাণীর সংখ্যা ৮৮।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ প্রজাতির মাছ জেলেদের জালে নিয়মিত ধরা পড়ে। তবে মৌসুমভেদে মাছের প্রাচুর্যে পরিবর্তন ঘটে। শীতকালে পাঙাশ, কাইন মাগুর, চাকা চিংড়ি ও হরিণা চিংড়ি বেশি পাওয়া যায়। বর্ষাকালে ভাঙন, ভোল, দাঁতিনা, জাওয়া, পারশে, পায়রা, নোনা ট্যাংরা ও ভেটকিসহ বিভিন্ন মাছের প্রাচুর্য বাড়ে।

রেঞ্জভিত্তিক হিসাবে শরণখোলায় ১৬৪ প্রজাতির মাছ শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরায় ১৫২, খুলনায় ১৪২ এবং চাঁদপাই রেঞ্জে ১২৩ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে।

কুমির, ভোঁদড় ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর উপস্থিতি

সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসেবে মাছ ছাড়াও অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর ওপর নিবিড় জরিপ চালানো হয়েছে। ৪২৪ কিলোমিটার নদী ও খাল জরিপ করে ৭৬টি লবণপানির কুমিরের দেখা পেয়েছেন গবেষকেরা।

অন্যদিকে, ৪৮৭ কিলোমিটার খাল জরিপে ৫১টি দলে মোট ১৭২টি ভোঁদড় দেখা গেছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্রে চার প্রজাতির পানিনির্ভর সাপ- রাজগোখরা, গোখরা, মেটে সাপ ও কুকুরমুখী জলসাপ এবং রামসংকে বা মেছো তক্ষকের উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। স্বাদুপানির পুকুরগুলোতে ১৫ প্রজাতির উভচর ব্যাঙের উপস্থিতি ও প্রজননের তথ্যও উঠে এসেছে।

সুন্দরবনের খালে ১৫১ প্রজাতির ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এবং ১১০ প্রজাতির জুপ্ল্যাঙ্কটন পাওয়া গেছে। এসব অণুজীব জলজ খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংরক্ষিত খাল রক্ষায় নতুন সুপারিশ

সুন্দরবনে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন নিশ্চিত করতে ১৯৮৯ সালে ১৮টি খালকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। এসব খালে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ খালের তুলনায় সংরক্ষিত খালগুলোর পরিবেশগত অবস্থা ও পানির মান ভালো। এগুলো পাঙাশ, বোয়াল, কই, টাকি, ট্যাংরা, পুঁটি, বাইম ও চিংড়ির গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্র ও আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে।

তবে দীর্ঘদিন পলি জমার কারণে শরণখোলা রেঞ্জের দাশেরভারণী খাল এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জের ছোট কেয়াখালী খালের মতো কয়েকটি সংরক্ষিত খাল ভরাট হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় নাব্য হারানো খালগুলোর পরিবর্তে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ থেকে বাস্তুসংস্থানগতভাবে উপযুক্ত খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খালকে নতুন সংরক্ষিত খাল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বন বিভাগের ক্যাম্প বা স্টেশনের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ৩০ মিটারের কম চওড়া ছোট খালগুলো এক বছর পরপর পর্যায়ক্রমে বন্ধ রাখার নীতি প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

বন বিভাগের মৎস্য বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ নিয়মিত গবেষণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একসময় বনের ২৩ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য ছিল। জলজ সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে বনের ৫৩ দশমিক ৫২ শতাংশ এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। এর কারণেও সামগ্রিক মাছ আহরণের পরিমাণ কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পের প্রস্তাবনায় গবেষণার সুপারিশগুলো যুক্ত করা হবে। এগুলো বাস্তবায়নে তাৎক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

নতুন প্রজাতির সন্ধান সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়েছে। তবে বড় মাছের আহরণ কমে যাওয়া, ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি এবং সংরক্ষিত খালের নাব্য হারানোর মতো সমস্যাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, এই সম্পদ রক্ষায় গবেষণালব্ধ সুপারিশ বাস্তবায়ন কতটা জরুরি।

আরও পড়ুন

নাব্যতা সংকটে তিস্তায় মাছের সংকট, পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

একসময় ভোর হলেই নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামতেন জেলেরা। জাল ফেললেই ধরা পড়ত টেংরা, বোয়াল, পাবদা, শিং, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। সেই মাছ বিক্রির...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

ইলিশের উৎপাদন কমছে কেন, বাড়াতে সরকারের নতুন উদ্যোগ

দেশের নদ-নদী ও উপকূলীয় জলসীমায় ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশ সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ জোরদার, নদীর নাব্য...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

বনরুইয়ের আঁশই কাল, পাচারের ফাঁদে পৃথিবীর একমাত্র আঁশযুক্ত স্তন্যপায়ী

প্রতি তিন মিনিটে একটি বনরুই চোরাশিকারিদের হাতে ধরা পড়ে, বনরুই পাচারের ভয়াবহতা বোঝাতে বহুল প্রচারিত এই পরিসংখ্যান প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। তবে পরিসংখ্যানটির বর্তমান...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

গুলশানে পোষা কুকুরের মৃত্যুতে মামলা: গাড়ি শনাক্ত, তদন্তে পুলিশ

রাজধানীর গুলশানে চার বছর বয়সী পোষা কুকুর কাইকে গাড়িচাপা দিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় একটি টয়োটা ফরচুনার গাড়ি শনাক্ত করেছে পুলিশ। গাড়িটির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ...
জাতীয়
0
minutes
spot_imgspot_img