বাংলাদেশে আখের একটি নতুন জাতকে ‘ব্ল্যাক রুবি’ নামে বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করেছে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই)। চলতি বছরের মার্চে অনুমোদন পাওয়া এ জাতটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিপাইনের কালো আখ বা ‘ব্ল্যাক সুগারকেইন’ নামেও পরিচিত।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, নরম ও রসালো এ আখের জাতটি চিবিয়ে খাওয়া সহজ। প্রচলিত আখের তুলনায় এতে প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণও কম বলে দাবি করছেন গবেষকেরা। দীর্ঘদিনের গবেষণা শেষে চলতি বছরের মার্চে জাতটি অবমুক্ত করা হয়েছে।
বিএসআরআইয়ের প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আনিছুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বহু বছরের গবেষণার পর আখের এ জাতটি বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে।
তবে সরকারি অনুমোদনের আগেই কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ আখের চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে জাতটি চাষে কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।
বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আখ দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। এটি দণ্ডাকৃতির, ডালপালাহীন একবর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। দেশের প্রতিটি জেলায় কমবেশি আখের চাষ হলেও জলবায়ুর কারণে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো এ ফসল চাষের জন্য বেশি উপযোগী।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে আখের উৎপাদন ছিল প্রায় ২১ লাখ টন।
কেন নাম ‘ব্ল্যাক রুবি’?
বিএসআরআই এখন পর্যন্ত আখের ৪৯টি জাত অবমুক্ত করেছে। সর্বশেষ অবমুক্ত জাতটি বিএসআরআই আখ ৪৯, যা কালো আখ বা ব্ল্যাক সুগারকেইন নামে পরিচিত।
তবে নতুন জাতটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ব্ল্যাক রুবি’।
ড. আনিছুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘তবে যখন কোনো নতুন জাত রিলিজ বা অবমুক্ত করা হয়, তখন সেটির জন্য জনপ্রিয় হতে পারে এমন কোনো নাম তারা নির্বাচন করার চেষ্টা করেন। আমরা আখের এই জাতটি রিলিজের সময় নাম দিয়েছিলাম ব্ল্যাক রুবি।’
নামকরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নামটা পপুলার হবে আর এই আখের কালারটা অনেকটা ডিপ পার্পল। সব মিলিয়ে এই নামেই রিলিজ হলো।’
তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটি এখনো ফিলিপাইনের কালো আখ নামেই পরিচিত।
নরম, রসালো ও চিবিয়ে খাওয়া সহজ
বিএসআরআইয়ের বিজ্ঞানীদের দাবি, ব্ল্যাক রুবি জাতের আখ প্রচলিত অন্যান্য জাতের তুলনায় নরম ও রসালো। এর আঁশের পরিমাণও ভালো। ফলে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খাওয়া সহজ। এমনকি গিঁটসহ আখটি চিবিয়ে খাওয়া যায়।
ড. আনিছুর রহমান বলেন, আখের এ জাতের রসে প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ তুলনামূলক কম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতটির গ্লাইসেমিক সূচক (জিআই) ৪০। সাধারণভাবে জিআই ৫০-এর বেশি হলে রক্তে শর্করা বাড়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘দাঁত দিয়ে চিবানো খুবই সহজ। এমনকি গিটসহ এটি চিবিয়ে খাওয়া যায়। আবার ক্যালসিয়াম, জিংক ও আয়রনের পরিমাণও প্রচলিত অন্য যে কোনো জাতের আখের চেয়ে বেশি।’
গবেষকদের ধারণা, এ আখের রস বাজারজাত করা গেলে শিশুরা বেশি উপকৃত হতে পারে। বাড়িতেও এর রস পান করা যেতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা।
তবে আখের রসে শর্করা থাকে। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি নিরাপদ কি না, তা নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল গুরুত্বপূর্ণ।
১০ মাসেই ১৬ থেকে ১৮ ফুট লম্বা
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্ল্যাক রুবি জাতের আখ অল্প সময়ের মধ্যেই কাটার উপযোগী হয়। মাত্র ১০ থেকে ১১ মাসে গাছটি ১৬ থেকে ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
আখটি যথেষ্ট মোটা এবং এতে রসের পরিমাণ বেশি। গাছের উচ্চতা ও ওজনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অন্য কিছুর সঙ্গে বেঁধে রাখতে হয়।
বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আখের পাতা দেখতে অনেকটা ভুট্টার পাতার মতো। তবে তা তুলনামূলক শক্ত, খাড়া, সুচালো ও কিনারায় ধারযুক্ত।
আখের দণ্ড সাধারণত ১ দশমিক ৮৫ থেকে ৩ দশমিক ৭২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৯ দশমিক ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। দণ্ড নরম বা শক্ত হতে পারে, তবে সব দণ্ডই গিঁটযুক্ত।
আখের দণ্ডের রংও বিভিন্ন ধরনের হয়। কোনোটি হালকা বেগুনি, কোনোটি সবুজ, আবার কোনোটি হলদে-সবুজ।
বাজারে প্রচলিত আখ সাধারণত ১০ ফুট বা তার কিছু বেশি লম্বা হয়। তবে ব্ল্যাক রুবি জাতের আখের উচ্চতা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
কীভাবে এলো এই জাত?
কালচে রঙের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্ল্যাক রুবি ফিলিপাইনের কালো আখ নামে পরিচিত। তবে কীভাবে এটি ফিলিপাইনের জাত হিসেবে পরিচিতি পেল, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
ড. আনিছুর রহমান জানান, গবেষণার জন্য প্রায় ৮ থেকে ৯ বছর আগে সাভারের একটি নার্সারি থেকে আখের এ জাত সংগ্রহ করে বিএসআরআই।
তিনি বলেন, ‘এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তারিত গবেষণা, প্রদর্শনী চাষাবাদ, কৃষকদের মাধ্যমে চাষসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে আমরা ব্ল্যাক রুবি নাম দিয়ে এটি রিলিজ করেছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচারের সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনের আখ নামে পরিচিত এ জাতের মতো আর কোনো আখ বাংলাদেশে নেই। এটি খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু।
তালহা জুবাইর মাসরুর বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গায় কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সময় ২০১৮ সালে ঢাকার বৃক্ষমেলা থেকে এর সন্ধান পেয়ে সংগ্রহ করেছিলাম। পরে আমরা এটি সংগ্রহ করে কৃষকদের ট্রায়াল দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এর মধ্যে একজন কৃষক খুবই সফল হয়েছিলেন।’
তিনি জানান, খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পেরেছেন, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন বিজ্ঞানী ফিলিপাইনে পিএইচডি করে ফেরার সময় আখের এ জাতটি নিয়ে আসেন। পরে তা গাজীপুরের একটি নার্সারিকে দেওয়া হয়।
মূলত ওই নার্সারি থেকেই জাতটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বিএসআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণার জন্য জাতটি সংগ্রহ করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার পর এবার বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হলো কালো আখের নতুন জাত ‘ব্ল্যাক রুবি’।






