চট্টগ্রামে কোনো কিছুতেই থামছে না পাহাড় কাটা। ২০০৭ সাল থেকে গত ১৬ বছরে পাহাড় ধসে ২৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যা গড়ে প্রতি বছর ১৫ জনের বেশি। পাহাড় ধস ও প্রাণহানি এড়াতে দীর্ঘ এই সময়ে নানা সিদ্ধান্তও নিয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। কিন্তু কোনো কিছুতেই থামছে না পাহাড় কাটা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত ৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ২৬তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সাতটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে পাহাড় কাটা বন্ধ করা। এ লক্ষ্যে সব সংস্থা কর্তৃক পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের হালনাগাদ তালিকা প্রদান সাপেক্ষে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। পাহাড়ে অবৈধ বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। উচ্ছেদ যাদের করা হবে তাদের পুনর্বাসনের চিন্তা-ভাবনা করা। পাহাড়ে বসতির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে অতীতে সংঘটিত পাহাড় ধসের বেশিরভাগই ঘটেছে ভারী বর্ষণের পর। কিন্তু গত শুক্রবার নগরীর আকবরশাহ থানার বেলতলী ঘোনায় পাহাড় ধস হয়েছে কোনো বৃষ্টি ছাড়াই। এর কারণ ছিল পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করা। অর্থাৎ পাহাড় কাটার সঙ্গে ধসের বিষয়টি এখানে স্পষ্ট। অবশ্য অতীতেও যেখানে পাহাড় ধস হয়েছে সেখানে পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাহাড় কাটার ফলে ভূমির ঢাল বৃদ্ধি পায়, গাছপালার আচ্ছাদন বিনষ্ট হয়, মাটির দৃঢ়তা হ্রাস পায় এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে। এতে পাহাড় ধস হয়। চট্টগ্রাম জেলায় অবৈধ বাসস্থান নির্মাণ, ইটভাটায় মাটি ব্যবহার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যই এ পাহাড় কাটা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাহাড় নিধনও। এ সময় বেশিরভাগ পাহাড় কাটা হয় সিটি করপোরেশনের পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখান বাজার মতিঝর্ণা, ষোলশহর ও ফয়েজ লেক এলাকায়। এর আগে ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৩২ বছরে নগর ও আশপাশের ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি আংশিক কেটে ফেলা হয়। এসব পাহাড় কাটার ঘটনায় ঘটে পাহাড় ধস ও প্রাণহানি।
১৬ বছরে ২৪৮ প্রাণহানি
গত ৭ এপ্রিল বিকাল পৌনে ৬টায় চট্টগ্রাম মহানগরীর আকবরশাহ থানাধীন বেলতলীঘোনা এলাকায় সর্বশেষ পাহাড় ধসের ঘটনায় মারা যান মো. মজিবুর রহমান খোকা (৪৫) নামে এক শ্রমিক। ওই এলাকায় সড়ক নির্মাণে ব্যাপকহারে পাহাড় কাটার সময় এ ধসের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন।
চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন। ওই বছর ২৪ ঘণ্টায় ৪২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ওই বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকা, লেডিস ক্লাব, শহরের কুসুমবাগ, কাছিয়াঘোনা, ওয়ার্কশপঘোনা, মতিঝর্না, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ প্রায় সাতটি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ওই দিন ভোরে অল্প সময়ের ব্যবধানে এসব পাহাড় ধসে নারী-শিশুসহ ১২৭ জনের মৃত্যু হয়।
২০২২ সালে ১৭ জুন পাহাড় ধসে নিহত হয় আরও চার জন। ওই দিন রাত ২টায় এবং ১৮ জুন ভোর ৪টায় নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ১ নম্বর ঝিল ও ফয়েজ লেক সিটি আবাসিক এলাকায় এ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হন। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখানবাজার মতিঝর্না এলাকায় পাহাড় ধসে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিল পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
২০১২ সালের ২৬ ও ২৭ জুন পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালে মতিঝর্নায় দেয়াল ধসে দুই জন মারা যান। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড় ধসে মারা যান তিন জন, একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় মারা যান মা-মেয়ে।
২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড় ধসে মারা যান চার জন। ২০১৯ সালে কুসুমবাগ আবাসিক এলাকা পাহাড় ধসে এক শিশু প্রাণ হারায়। পাহাড় ধসে এত প্রাণহানির পরও বন্ধ হয়নি পাহাড় কাটা, দখল ও বসতি স্থাপনা। ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাহাড় ধস এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আরও ১২১ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সবমিলে ২০০৭ সাল থেকে গত ১৬ বছরে নগরে ও আশপাশে পাহাড় ধসে ২৪৮ জন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এত হতাহতের পরও বন্ধ হচ্ছে না চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বসতি স্থাপন ও বসবাস। উল্টো পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখলদারদের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। পাহাড় কাটার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় ২০২২ সালেও ২০টি এবং ২০২১ সালে ছয়টি মামলা করেছে পরিবেশ অধিদফতর।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়া গেলেই অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে অথবা মামলা করা হচ্ছে। ২০২২ সালে পাহাড় কাটার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ২০টি মামলা করা হয়েছে। ২০২১ সালেও ছয়টি মামলা করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে পাহাড় ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপকমিটির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে। এর মধ্যে ১৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৮৩৫ পরিবার বসবাস করে। ১৭ পাহাড়ের মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০ পাহাড়ে অবৈধভাবে বাস করছে ৫৩১ পরিবার। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন সাত পাহাড়ে বাস করছে ৩০৪ পরিবার। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণের সময় নতুন করে ১৬টি পাহাড় কাটা হয়। সেসব পাহাড়ে নতুন করে বসতি গড়ে উঠেছে।
পাহাড় কাটার কৌশল হিসেবে ছোট ছোট বসতি স্থাপনের মাধ্যমে প্রথমে পাহাড় দখল করা হয়। এরপর পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা হয় বসতি। পরে সুবিধাজনক অংশে এবং পাহাড়ের বিভিন্ন বসতির অন্তরালে বিরামহীনভাবে চলে পাহাড় কাটা। একসময় সেই অংশে পাহাড় কাটা শেষ হলে বসতি অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আবার কোথাও কোথাও ভিন্ন পদ্ধতিতেও পাহাড় কাটা হচ্ছে। নির্দিষ্ট পাহাড় কাটার পূর্বে প্রথমে এর কিছু অংশে ৯০ ডিগ্রি খাড়াভাবে কাটা হয়। তারপর যেসব পাহাড় খাড়াভাবে কাটা হয়েছে তার চূড়ায় কিছু দূর অন্তর অন্তর খালের মতো করে কেটে ফেলা হয়, যাতে বৃষ্টির পানিতে পাহাড়ের মাটি সহজেই ধসে পড়ে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদের বিষয়ে সারা বছরই অভিযান চালানো হয়। আকবরশাহ এলাকায় ধসের স্থানে গত ১১ ফেব্রুয়ারি অভিযান চালানো হয়। এ সময় এক ব্যক্তিকে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত একটি এস্কেভেটর জব্দ করা হয়। এরপরও পাহাড় কাটা থেকে জড়িতদের সরানো যায়নি। গত সপ্তাহে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের উচ্ছেদের অভিযান জোরদার করা হবে।
উচ্ছেদ অভিযান কবে শুরু হবে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে কার্যক্রম শুরু করা হবে।






