কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের মোট জনসংখ্যার ১৬৫.১৬ মিলিয়নের মধ্যে ৬৮.৪৬ শতাংশ মানুষ গ্রামাঞ্চলে বাস করে এবং মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কৃষি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকাণ্ডের নিরবচ্ছিন্ন গতিশীলতাই নির্ধারণ করে সামগ্রিক দেশের অগ্রগতি।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ নজরে আসে কৃষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন। তিনি কৃষিতে মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান মর্যাদা ঘোষণা করেন এবং আগামী দিনে আধুনিক কৃষিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে সবার কাছে আহ্বান রাখেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই সিদ্ধান্ত ও নতুন নতুন কর্মপরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে থাকে দেশের সামগ্রিক কৃষি। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে। কিন্তু সম্ভাবনার অগ্রযাত্রার শুরু হওয়ার মাত্র কিছুকাল পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই কালরাতের হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে জনমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিসহ বহুল আকাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলার স্বপ্ন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ের সরকার ব্যবস্থায় কৃষিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে শিল্পকারখানা নির্ভর অর্থনীতি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ কর্মপরিকল্পনায় জোর দেওয়া হয়। ফলে অবহেলিত হয়ে পড়ে বাংলাদেশের কৃষি। কৃষকদের নানা ধরনের ভোগান্তি ও কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকায় গুরুত্ব হারায় দেশের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন, তখন থেকেই পিতার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষিকে আবার উজ্জীবিত করে তুলতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কৃষিতে ভর্তুকি, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণসহ নানা উদ্যোগের ফলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলার কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে যে দেশ তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কোনো কোনো অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, সেই দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে আবার হুমকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের কৃষি। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, উপকূলবর্তী এলাকার আবাদি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ ও গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণে পরিবর্তনশীলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। ধারণা করা হচ্ছে, যা জলবায়ুর এই পরিবর্তন দেশের কৃষিতে যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষির সফল উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে জলবায়ুর অবস্থার ওপর। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাসসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে লবণাক্ততা উপকূলীয় অঞ্চলের আরও ৪ কিলোমিটার উত্তর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা ওই অঞ্চলের চাষের জমির পরিমাণ কমিয়ে দেবে। এক সমীকরণে দেখা গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের বনাঞ্চল ধ্বংস হলে দেশের বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস পাবে এবং ক্রমান্বয়ে পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ কৃষি ব্যবস্থাসহ আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দেশের উওরাঞ্চলে খরার প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া এবং বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে স্বাভাবিক কৃষি ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে, যা কি না উৎপাদন হ্রাসসহ গুণগত মানসম্পন্ন ফলন উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গত চার দশকে বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে গড় দৈনিক তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.১০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে।
অনুমান করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সালের মধ্যে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বাষ্পীভবন বেড়ে যায়, যার ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং সময় (ঋতু) পরিবর্তন হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণে পরিবর্তন হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশের বেশি সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভর করে এবং এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭.২২ শতাংশ। পরিবেশের ভারসাম্য ব্যাহত হলে কৃষির ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে তেমন বৃষ্টি হচ্ছে না, কিন্তু আশ্বিন মাসে টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। খরাসহ বিভিন্ন কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ কাজে ব্যবহারের পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
ফলে কৃষি উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ততা ও খরা মোকাবিলা করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ফসলের বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এগুলো চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষি ঝুঁকির কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হচ্ছে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রত্যাশিত ঝুঁকি লাঘব করতে আরও গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক তাপমাত্রার পরিবর্তনসহ জলবায়ু পরিবর্তন যত দ্রুত গতিতে হচ্ছে, তার চেয়ে আমাদের প্রস্তুতি ঠিক ততটা গতি পাচ্ছে না। অন্য কথায়, আমাদের আরও গুরুত্বের সঙ্গে আগ্রহ সহকারে গবেষণা সম্প্রসারণ কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। অধিক জনবহুল এই দেশের মানুষের নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।






