২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সরকারি সব নির্মাণকাজে প্রচলিত পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। এ লক্ষ্যে ২০১৯ সালে একটি পরিপত্র জারি করা হয়, যেখানে সরকারি অবকাঠামো ও সড়ক নির্মাণসহ সব প্রকল্পে কংক্রিট ব্লক ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, উদ্যোগটি এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সফলতা পায়নি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “শুরুর দিকে আমাদের লক্ষ্য ছিল সরকারি সব ধরনের নির্মাণকাজে কংক্রিট ব্লক ও হোলো ব্রিক ব্যবহার করা। তবে দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ সরকারি প্রকল্পেই এখনো প্রচলিত ইট ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ধরে নেওয়া যায়, এই লক্ষ্যটি মূলত ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি জানান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনা করে। এর মধ্যে শুধু গণপূর্ত মন্ত্রণালয় শতভাগ পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পেরেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক জানান, সরকারি নির্মাণকাজের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা নতুন সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নির্দেশনা আরোপের পরিকল্পনা করছি, যাতে শতভাগ পরিচ্ছন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।”
মাটি ও জলবায়ুর জন্য বাড়ছে ঝুঁকি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাড়ায় নির্মাণসামগ্রীর চাহিদাও বেড়েছে। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে পোড়ামাটির ইট, যা তৈরিতে কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাত হাজার ইটভাটায় বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ইট উৎপাদিত হয়। এই উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় প্রায় ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি। ফলে বহু জমি অন্তত তিন বছর পর্যন্ত চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।
এ ছাড়া প্রচলিত ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ও কয়লা ব্যবহারের কারণে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণও বাড়ছে। দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৩ শতাংশের জন্য ইটভাটা শিল্প দায়ী বলে জানা গেছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ নির্গমন কমানোর অঙ্গীকার করলেও এ খাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিকল্প থাকলেও বাড়ছে না ব্যবহার
সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০১৯ সালের আইনে “ইট”-এর সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, মাটি ব্যবহার ছাড়াই এবং ভাটায় না পুড়িয়ে তৈরি নির্মাণসামগ্রীকেও ইট হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) বিভিন্ন বিকল্প উপকরণ নিয়ে গবেষণা করে। প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে, সিমেন্ট, বালু, ড্রেজিং করা মাটি ও লোহার জাল ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব ব্লক তৈরি করা সম্ভব।
এর মধ্যে কম্প্রেসড স্ট্যাবিলাইজড আর্থ ব্লক (সিএসইবি) উল্লেখযোগ্য। সিমেন্ট ও নদীর পলিমাটি দিয়ে তৈরি এই ব্লকের উৎপাদন খরচ প্রচলিত ইটের প্রায় অর্ধেক বলে জানিয়েছে এইচবিআরআই।
তবে উৎপাদকদের দাবি, অতিরিক্ত করের কারণে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লকস অ্যান্ড পেভার্স ম্যানুফ্যাকচারার সোসাইটির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “দেশের মোট ইটের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন করতে পারছি না, কারণ বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত লাভ পাচ্ছেন না।”
তিনি জানান, বর্তমানে উৎপাদন খরচের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রচলিত ইটভাটাগুলো প্রথম পাঁচ লাখ ইট উৎপাদনের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে থাকে, যা বিকল্প পণ্যের তুলনায় তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।
তার মতে, পরিবেশবান্ধব ইটের দাম কমানো গেলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে এর চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।






