দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’খ্যাত কর্ণফুলী নদী আজ দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নদীটি রক্ষায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দূষণরোধের দাবি উঠেছে ‘বিনি সুতার মালা’ শীর্ষক এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে।
শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নগরের সদরঘাট থেকে লাম্বুরহাট পর্যন্ত সাম্পানে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে নদীর দুই তীরের ঘাট, বাজার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। আঞ্চলিক গান, নৃত্য ও বক্তব্যের মাধ্যমে নদী রক্ষা, মাঝিদের অধিকার এবং চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সংরক্ষণের আহ্বান জানান আয়োজক ও বক্তারা।
চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র এবং কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘সাম্পান খেলা ও চাঁটগাইয়া সংস্কৃতি মেলা’র প্রথম দিনের আয়োজন ছিল এই ‘বিনি সুতার মালা’ অনুষ্ঠান।
নদীর দুই পাড়ের প্রায় ৩০টি ঘাট ও নদীপারের জনবসতিতে আলোচনা, গান ও নাচের মাধ্যমে কর্ণফুলীকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখার আহ্বান জানানো হয়। ভাসমান নৌযানে নির্মিত মঞ্চ থেকে সদরঘাট, চরপাথরঘাটা, নয়াহাট, কালুরঘাট, বোয়ালখালী ও লাম্বুরহাটসহ বিভিন্ন ঘাটে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আলীউর রহমানের সভাপতিত্বে এবং কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের উপদেষ্টা মির্জা ইসমাইলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ডা. মাহজুর রহমান।
বক্তারা বলেন, কর্ণফুলী নদী বর্তমানে চারদিক থেকে দখল ও দূষণের শিকার। নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও একটি প্রভাবশালী মহল তা উপেক্ষা করে নদী দখল ও দূষণ অব্যাহত রেখেছে।
তাঁরা আরও বলেন, নদী দূষণের জন্য শুধু সাধারণ মানুষ নয়, নদী ব্যবহারকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ও বেশি। নদীতীরবর্তী বিভিন্ন কলকারখানা নিয়মিত বর্জ্য ও ময়লা ফেলায় নদী ভরাট ও দূষিত হচ্ছে। এ অবস্থায় শিল্পকারখানাগুলোতে ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবহারের ওপর জোর দেন বক্তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিক নেতা চৌধুরী ফরিদ বলেন, “কর্ণফুলী নদী বাঁচলে চট্টগ্রাম বাঁচবে। কর্ণফুলী নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।” তিনি নদী রক্ষায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের অব্যবস্থাপনায় নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার অভিযোগ তোলেন।
আলীউর রহমান বলেন, কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা দ্রুত উচ্ছেদ এবং নদীকে দূষণমুক্ত করতে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করেন, শস্য খালাসের আড়ালে অভয়মিত্র ঘাটের লাইটার জেটিতে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য খালাস করা হচ্ছে। এসব স্ক্র্যাপ নদীতে পড়ে পানি ও বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে, যার প্রভাবে ফিরিঙ্গিবাজার ও বন্দর আবাসিক এলাকার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সামুদ্রিক প্রাণী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ঝুঁকিতে পড়ছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে কঠোর প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন জসিমউদ্দিন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন মির্জা বাহার উদ্দিন, এম মঈন উদ্দিন, সেলিম খান, জসিম উদ্দিন, এম পেয়ার আলী, জাফর আহমদ, লোকমান দয়াল, মুছা মেম্বার, এম মুছা সিকদার, রমজান আলী রমু, বাহাদুর, মাহবুব আলম, আকিব জাবেদ, সালাউদ্দিন, রানা ও গাজীসহ অনেকে। সাংস্কৃতিক পর্বে নৃত্য পরিবেশন করেন রাইটেন দাশ ও তাঁর দল।
আয়োজকরা জানান, দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে শনিবার বেলা ১১টায় অভয়মিত্র ঘাট থেকে সাম্পান শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। আর রবিবার বিকেল ৩টায় অভয়মিত্র ঘাট থেকে চরপাথরঘাটা সিডিএ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে সাম্পান খেলা ও চাঁটগাইয়া সংস্কৃতি মেলা।






