দায়িত্ব যাদের, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ: চট্টগ্রামে ৫০ বছরে নিশ্চিহ্ন প্রায় ২০০ পাহাড়

আদালতের নিষেধাজ্ঞা, সরকারি অভিযান ও নানা উদ্যোগের পরও চট্টগ্রামে থামছে না পাহাড় কাটা। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের তথ্য বলছে, গত পাঁচ দশকে জেলার ছোট-বড় প্রায় ২০০ পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাহাড় ধ্বংসের পেছনে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ভুল জরিপ, পাহাড়ি ভূমিতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাহাড় রক্ষায় দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন জরিপ ও রেকর্ড অধিদপ্তর ও ভূমি অফিস, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর বাইরে জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে, ওয়াসা, গণপূর্ত বিভাগ ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার উদাসীনতার অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাহাড় ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় শুরুতেই ভূমিকা রেখেছে ভুল ভূমি জরিপ। চট্টগ্রামের শতাধিক পাহাড়কে বিএস জরিপে পুকুর, ভিটা, বাগান, শণখোলা ও নাল জমিসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ি জমির প্রকৃত পরিচয় হারিয়েছে সরকারি নথিতে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটা ও বসতি সম্প্রসারণের পথ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।

অন্যদিকে সিডিএর বিরুদ্ধে পাহাড়ি এলাকায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বায়েজিদ লিংক রোড নির্মাণের সময় সিডিএ নিজেই ১৬টি পাহাড় কেটেছে বলে তথ্য রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে মামলা ও জরিমানা করলেও পাহাড় কাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক মো. জিয়াউদ্দীন পাহাড় কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, নানা কারণে পাহাড় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ভুল জরিপও একটি সমস্যা। কীভাবে জরিপ সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে চেষ্টা চলছে।

পাহাড়ি জমিতে ভবনের অনুমোদন

চট্টগ্রাম নগরীর পশ্চিম খুলশী জালালাবাদ এলাকার ১ নম্বর গার্ডেন হাউজিং সোসাইটি সড়কের পাহাড়ি ভূমিতে ‘সেন্ট্রাল হোমস’ নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনা সামনে এসেছে। খুলশী মৌজার ওই জমিটি সরকারি নথিতে টিলা শ্রেণির। পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর ভবন মালিকদের জরিমানাও করেছিল।

তবে ২০২৪ সালে সিডিএ ভবনটির ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। সিডিএর নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী স্বাক্ষরিত অনাপত্তিপত্রে জমিটি টিলা শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর সেই ছাড়পত্র দেয়নি। এরপরও একই বছরের ডিসেম্বরে নয়তলা ভবনটির নকশা অনুমোদন করে সিডিএ। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির নির্মাণকাজ তৃতীয় তলা পর্যন্ত এগিয়েছে।

২০২৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস সিডিএকে দেওয়া এক চিঠিতে অভিযোগ করেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) উপেক্ষা করে পাহাড়, টিলা বা পুকুর হিসেবে শ্রেণিভুক্ত জমিতেও ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

চিঠিতে আরও কয়েকটি ভবনের নকশা অনুমোদনের তথ্য উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ২০১৬ সালে পাহাড়তলী মৌজার বিএস দাগ নম্বর ১১০ (অংশ)-এর টিলা শ্রেণির জমিতে আটতলা ভবন, ২০২৩ সালে খুলশী মৌজার বিএস দাগ নম্বর ২৫ (অংশ)-এর টিলা শ্রেণির জমিতে ছয়তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া পূর্ব নাছিরাবাদ মৌজার বিএস দাগ নম্বর ২৮১ (অংশ)-এর টিলা শ্রেণির জমিতে ২০০৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ছয়টি ভবনের নকশা অনুমোদন এবং ২০২০ সালে আসকারদীঘি এলাকায় গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক পাহাড়ের পাদদেশে ১৪ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের তথ্যও চিঠিতে রয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, অতীতে সিডিএ অনেক পাহাড়ি জায়গায় নকশা অনুমোদন করেছে। তবে এখন আইন অনুযায়ী বাস্তব পরিস্থিতি দেখে নকশা দেওয়ার জন্য তাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সিডিএর অথরাইজড কর্মকর্তা-১ কাজী কাদের নেওয়াজ বলেন, টিলা শ্রেণির জমিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে পাহাড়ি ভূমিতে অনুমোদন দেওয়া হয় না।

সরকারি জরিপেই নেই পাহাড়

স্বাধীনতার পর শুরু হওয়া বিএস জরিপ ১৯৮৫ সালে সম্পন্ন হয়। ওই জরিপে চট্টগ্রামের অনেক পাহাড়কে নাল, শণখোলা, খিলা ও বাড়িভিটাসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরবর্তীতে এই ভুল শ্রেণিবিন্যাস পাহাড় দখল ও কাটার সুযোগ তৈরি করেছে।

জেলা প্রশাসনের ২০২৪-২৫ সালের চিহ্নিতকরণে দেখা গেছে, বাস্তবে পাহাড় বা টিলা রয়েছে কিন্তু সরকারি জরিপে তা পাহাড় হিসেবে নেই। নগরীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এমন ভুল পাওয়া গেছে কাট্টলী ভূমি সার্কেলের অধীন খুলশী মৌজায়। সেখানে ৮২ দশমিক ১৪ একর পাহাড়কে শণখোলা হিসেবে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব পাহাড়ি এলাকার অর্ধেকের বেশি অংশে বর্তমানে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে।

একই সার্কেলের পূর্ব নাছিরাবাদে প্রায় ১৩ একর এবং পশ্চিম পাহাড়তলীতে সাড়ে ১৩ একর পাহাড়ি ভূমির শ্রেণিও ভুলভাবে জরিপ করা হয়েছে। নগরীর বাইরে বিএস জরিপে সবচেয়ে বেশি প্রায় সাড়ে ১২০০ একর, পাহাড় ও টিলার শ্রেণি পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। সীতাকুণ্ডে এই পরিবর্তনের পরিমাণ ৮৯ একর।

চট্টগ্রাম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, প্রায় ৪০ বছর আগে বিএস জরিপের সময় এ ধরনের শ্রেণি নির্ধারণে ভুল হয়েছিল। এখন এসব সংশোধনের দায়িত্ব জরিপ দপ্তরের নেই; আদালতের মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে।

তবে বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন জানান, আগে জেলা প্রশাসন তাড়াহুড়া করে একটি তালিকা দিয়েছিল। জরিপ সংশোধনের আগে সব সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে আবার তালিকা চাওয়া হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাহাড় কাটার পর ব্যবস্থা, ততক্ষণে গড়ে ওঠে বসতি

পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা তৈরির পর পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। পূর্ব নাছিরাবাদ মৌজার নাগিন পাহাড়ের অংশ কেটে গড়ে উঠেছে গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকা। প্রায় দুই যুগ আগে পাহাড় কাটার পর সেখানে এখন প্রায় ৫০টি ভবন রয়েছে। অথচ ২০১৯ সালে এসে পরিবেশ অধিদপ্তর পাহাড় কাটার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আবাসিক এলাকার ২৯টি ভবনকে জরিমানা করে।

গ্রিনভ্যালি আবাসিকের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম বলেন, সিডিএর অনুমোদন নিয়েই এখানে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনগুলো প্রায় দুই যুগ আগে নির্মিত এবং পরিবেশ অধিদপ্তর একবার জরিমানা করেছিল।

আসকারদীঘির পাড়ের গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক পাহাড় কাটার সময়ও ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও পাহাড় রক্ষা করা যায়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাহাড় কাটার অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১৯টি। খুলশী থানার রূপসী পাহাড়ও প্রায় তিন বছর ধরে কাটার অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, রূপসী পাহাড় শণখোলা শ্রেণিভুক্ত। এ বিষয়ে মামলা ও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে জরিপ সংশোধনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া নগরীর পাহাড় রক্ষা করা কঠিন।

৫০ বছরে হারিয়েছে প্রায় ২০০ পাহাড়

চট্টগ্রামের পাহাড় ধ্বংসের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণাতেও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সিরাজুল হকের ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘হিল কাটিং ইন অ্যান্ড অ্যারাউন্ড চিটাগং সিটি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি পাহাড় আংশিক কাটা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে নগরীর পাঁচ থানা এলাকায় পাহাড়ের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ০২ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ মাত্র ৩৩ বছরে ১৮ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে গত কয়েক দশকে চট্টগ্রামের দুই শতাধিক পাহাড় অস্তিত্ব হারিয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্ন অভিযান সত্ত্বেও পাহাড় রক্ষায় সরকারি জরিপের ভুল সংশোধন, পাহাড়ি জমিতে ভবন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং অবৈধ দখল ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না হলে এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: আগামীর সময়

আরও পড়ুন

নগর জলাভূমি হারানোর নেপথ্যে কী, ১৪ গবেষণায় অনুসন্ধান

শহরের বুক থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে জলাভূমি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা নগর জলাভূমির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে...
জলসম্পদ
0
minutes

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শব্দদূষণ ও কালো ধোঁয়ার বিরুদ্ধে অভিযান, জরিমানা ১৪...

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যানবাহনের শব্দদূষণ ও কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ সময় ১৫টি যানবাহন পরীক্ষা করে মাত্রাতিরিক্ত...
দূষণ ও দখল
0
minutes

সমুদ্রে কয়েক ঘণ্টায় ভেঙে যাবে প্লাস্টিক, নতুন উপাদান তৈরি করলেন জাপানের...

সমুদ্রে বছরের পর বছর ভেসে বেড়ানো প্লাস্টিক একসময় ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এসব কণা জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে, ছড়িয়ে পড়ে খাদ্যশৃঙ্খলে। শেষ পর্যন্ত...
দূষণ ও দখল
0
minutes

সুন্দরবনের বাতাসে বিপজ্জনক মাত্রায় দূষণ, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পরাগায়ন

বনাঞ্চলকে সাধারণত বিশুদ্ধ বাতাসের আধার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কয়েকটি এলাকায় বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ও ক্ষুদ্র বস্তুকণার মাত্রা...
দূষণ ও দখল
0
minutes
spot_imgspot_img