বিশ্ব গরিলা দিবস: যে প্রাণী বাঁচিয়ে রাখে আফ্রিকার বন, তার অস্তিত্বই আজ বিপন্ন

পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী প্রাণী হয়েও মানুষের কর্মকাণ্ডের কাছে অসহায় গরিলা। বন উজাড়, অবৈধ শিকার, রোগব্যাধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার এই বিস্ময়কর প্রাণীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। অথচ গরিলা শুধু বনের বাসিন্দা নয়, আফ্রিকার বিশাল বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় তার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিপন্ন এই প্রাণীকে রক্ষা এবং তার আবাসস্থল সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব গরিলা দিবস।

ঘন সবুজ অরণ্যের গভীরে বিশালদেহী একটি গরিলা তার শাবককে বুকে আগলে বসে আছে। আশপাশে পরিবারের অন্য সদস্যরা খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত। হঠাৎ কোনো বিপদের আভাস পেলে দলের প্রধান পুরুষ গরিলাটি সতর্ক হয়ে ওঠে। নিজের শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গরিলার এই পারিবারিক জীবন, সামাজিক বন্ধন ও বুদ্ধিমত্তা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে আসছে। মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বিবর্তনীয় সম্পর্ক থাকা এই প্রাণী মানুষের মতোই আনন্দ, ভয়, শোক ও পারস্পরিক স্নেহের নানা আচরণ প্রকাশ করতে পারে।

কেন ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব গরিলা দিবস?

বিশ্ব গরিলা দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মার্কিন প্রাণিবিজ্ঞানী ও সংরক্ষণবিদ ডায়ান ফসির নাম। ১৯৬৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পর্বতমালায় গরিলা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য কারিসোকে গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর গবেষণা পাহাড়ি গরিলার সামাজিক জীবন ও আচরণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেয়। অবৈধ শিকারের বিরুদ্ধে তাঁর কাজ এবং গরিলা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

তাঁর এই অবদানকে স্মরণ করে ২০১৭ সালে প্রথম বিশ্ব গরিলা দিবস পালিত হয়। দিনটি এখন গরিলা সংরক্ষণে গবেষক, বনরক্ষী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশবাদীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতীক।

পৃথিবীতে কত গরিলা অবশিষ্ট আছে?

পৃথিবীতে দুই প্রজাতির গরিলা রয়েছে- পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গরিলা। প্রতিটি প্রজাতির দুটি করে উপপ্রজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে পাহাড়ি গরিলা, পূর্বাঞ্চলীয় নিম্নভূমির গরিলা, পশ্চিমাঞ্চলীয় নিম্নভূমির গরিলা এবং ক্রস রিভার গরিলা উল্লেখযোগ্য।

পাহাড়ি গরিলা

রুয়ান্ডা, উগান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পাহাড়ি অরণ্যে এদের বসবাস। ২০১৯ সালে প্রকাশিত শুমারি অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ১ হাজার ৬৩টি পাহাড়ি গরিলা ছিল। সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলীয় নিম্নভূমির গরিলা

গ্যাবন, কঙ্গো ও মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন বনাঞ্চলে এদের বসবাস। সংখ্যায় তুলনামূলক বেশি হলেও অবৈধ শিকার, বন ধ্বংস ও ইবোলা ভাইরাসের কারণে এরা মহাবিপন্ন।

ক্রস রিভার গরিলা

নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে বসবাসকারী এই উপপ্রজাতি অত্যন্ত বিরল। ২০২৫ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বনে প্রায় ২৫০টি পূর্ণবয়স্ক ক্রস রিভার গরিলা অবশিষ্ট থাকার ধারণা করা হয়।

গরিলা কেন বনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

গরিলাকে আফ্রিকার অরণ্যের প্রাকৃতিক মালি বলা যায়। ফলমূল, পাতা, কাণ্ড ও বিভিন্ন উদ্ভিদ খেয়ে তারা বনের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিচরণ করে। তাদের মলের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বড় আকারের বীজ ছড়ানোর ক্ষেত্রে গরিলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া খাবার সংগ্রহ ও চলাচলের সময় তারা বনের গাছপালার মধ্যে ছোট ছোট ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় এবং নতুন উদ্ভিদ জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। এভাবেই গরিলা বন পুনর্জন্ম ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

শক্তিশালী প্রাণী, অথচ মানুষের কাছেই অসহায়

গরিলার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার ও সংক্রামক রোগ। কৃষিজমি সম্প্রসারণ, কাঠ সংগ্রহ, সড়ক নির্মাণ ও খনিজ উত্তোলনের কারণে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।

বিশ্ব প্রকৃতি তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলীয় নিম্নভূমির গরিলার মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ সংরক্ষিত এলাকায় বাস করে। ফলে অধিকাংশ গরিলা শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

গরিলা মানুষের সংস্পর্শে এলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রামক রোগেও আক্রান্ত হতে পারে। অন্যদিকে ইবোলা ভাইরাস অতীতে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক গরিলার মৃত্যুর কারণ হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে পাহাড়ি গরিলার বিচরণক্ষেত্র অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ কম।

সংরক্ষণে আশার আলো

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও পাহাড়ি গরিলা সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, বনরক্ষীদের নিয়মিত টহল, গবেষণা ও দায়িত্বশীল পর্যটন এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) পাহাড়ি গরিলাকে মহাবিপন্ন থেকে বিপন্ন শ্রেণিতে স্থানান্তর করে। তবে অন্য উপপ্রজাতিগুলোর অস্তিত্ব এখনো মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে।

বিশ্ব গরিলা দিবস তাই কেবল একটি প্রাণীকে রক্ষার আহ্বান নয়, বরং আফ্রিকার বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য এবং বননির্ভর মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষারও আহ্বান। গরিলাকে বাঁচাতে হলে তার বনকে বাঁচাতে হবে। আর সেই বন রক্ষায় প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের জীবিকা, বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়।

আরও পড়ুন

কার্বনের ছয় রং: পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব ফেলে?

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় ‘কার্বন’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। তবে কার্বন সব সময় একই রূপে থাকে না, আর এর সব ধরন পরিবেশের ওপর...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

উটের চোখের পানিতে ২৬ সাপের বিষের প্রতিষেধক, দাবিটি কতটা সত্য?

উটের চোখের পানিতে এমন অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা দুই ডজনেরও বেশি প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি কৌতূহল...
জাতীয়
0
minutes

ডাইনোসর বিলুপ্ত, তবু টিকে গেল কুমির: রহস্য উন্মোচন

পৃথিবী থেকে একসময় হারিয়ে গেছে বিশালাকার ডাইনোসর। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes
spot_imgspot_img