লেখা: উত্তম কুমার ঘোষ
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত হাতিয়ারের ইতিহাস। যে মানুষ একদিন পাথরের টুকরো ধারালো করে শিকার ধরেছিল, সেই মানুষই আজ এমন এক হাতিয়ার তৈরি করেছে, যা মানুষের মতো চিন্তা করতে, ভাষা বুঝতে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজে সহায়তা করতে পারে। সেই হাতিয়ারের নাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
প্রস্তর যুগে মানুষের প্রধান হাতিয়ার ছিল প্রস্তর। পাথরকে ধারালো করে মানুষ শিকার করেছে, খাদ্য সংগ্রহ করেছে, আত্মরক্ষা করেছে। তারপর এসেছে ব্রোঞ্জ যুগ। পাথরের জায়গা নিয়েছে ধাতু। আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরপর লৌহ যুগে লোহা মানুষের হাতে দিয়েছে আরও শক্তিশালী অস্ত্র, কৃষির সরঞ্জাম এবং নির্মাণের উপকরণ। প্রতিটি যুগে হাতিয়ারের পরিবর্তন শুধু কাজের পদ্ধতিই বদলায়নি; বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন, অর্থনীতি, যুদ্ধ, কৃষি, বাণিজ্য, সামাজিক কাঠামো এবং ক্ষমতার বিন্যাস।
অর্থাৎ, হাতিয়ার কখনো শুধু একটি বস্তু নয়। হাতিয়ার হলো মানুষের শ্রমের সম্প্রসারিত শক্তি।
শ্রমই সভ্যতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। মানুষ চিন্তা করে, শ্রম দেয় এবং হাতিয়ারের মাধ্যমে সেই শ্রমকে কার্যকর করে। একটি সাধারণ পাথর থেকে শুরু করে লাঙল, চাকা, ধাতব অস্ত্র, বাষ্পীয় ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ, কম্পিউটার, সবই মানুষের শ্রমকে আরও দ্রুত, আরও দূরবর্তী এবং আরও ব্যাপক করার হাতিয়ার।
চাকার আবিষ্কার মানুষের চলাচল বদলে দিয়েছে। লাঙল কৃষির উৎপাদন বাড়িয়েছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছে। বিদ্যুৎ রাতকে দিনের কাজে যুক্ত করেছে। কম্পিউটার তথ্যপ্রক্রিয়াকে বদলে দিয়েছে। ইন্টারনেট পৃথিবীর দূরত্বকে সংকুচিত করেছে। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তা, জ্ঞান ও সৃজনশীল শ্রমের কিছু অংশকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
এ কারণেই এআইকে শুধু নতুন কোনো প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। এটি মানুষের তৈরি এমন এক নতুন প্রজন্মের হাতিয়ার, যার প্রভাব মানুষের শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমেও পড়ছে।
একজন কৃষক লাঙল দিয়ে জমি চাষ করেন। একজন শ্রমিক যন্ত্র দিয়ে উৎপাদন করেন। একজন প্রকৌশলী কম্পিউটার দিয়ে নকশা তৈরি করেন। একজন সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তির সহায়তা নেন। এখন একই ধারায় মানুষ এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, ভাষা তৈরি করতে পারে, ছবি ও শব্দ নিয়ে কাজ করতে পারে, কোড লিখতে পারে এবং নানা ধরনের জটিল কাজের সহকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
এখানেই বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে, হাতিয়ার কি মানুষের শ্রমকে প্রতিস্থাপন করবে, নাকি মানুষের শ্রমকে আরও শক্তিশালী করবে?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নতুন হাতিয়ার আসার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্ন নতুন নয়। যন্ত্র যখন কারখানায় প্রবেশ করেছিল, তখনও মানুষের শ্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার পরও একই প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কাজের ধরন বদলে নতুন কাজের সৃষ্টি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে কিছু পেশা ও দক্ষতার প্রয়োজন কমেছে, আবার নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও সম্ভবত মূল পরিবর্তনটি হবে কাজের ধরনে। যে কাজ মানুষ একসময় নিজে করত, তার কিছু অংশ হয়তো যন্ত্র করবে। ফলে মানুষের শ্রমের মূল্য শেষ হয়ে যাবে, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে মানুষের ভূমিকা কীভাবে বদলাবে।
কারণ হাতিয়ার যতই শক্তিশালী হোক, হাতিয়ারের ব্যবহার নির্ভর করে মানুষের ওপর। ছুরি রান্নার কাজে যেমন ব্যবহৃত হতে পারে, তেমনি অপরাধেও ব্যবহৃত হতে পারে। পারমাণবিক প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহৃত হতে পারে, আবার যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবেও। প্রযুক্তির চরিত্র তাই শুধু প্রযুক্তির ক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্দেশ্যের মাধ্যমে।
এই জায়গাতেই আইন ও নীতির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে
মানুষ যখন নতুন হাতিয়ার তৈরি করেছে, তখন সেই হাতিয়ারকে ঘিরে নতুন নিয়মও তৈরি হয়েছে। কৃষি সমাজে জমি, শ্রম ও সম্পত্তিকে ঘিরে আইন তৈরি হয়েছে। শিল্পযুগে কারখানা, শ্রমঘণ্টা, শ্রমিকের অধিকার, মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে আইন এসেছে। মোটরগাড়ি এসেছে, তাই ট্রাফিক আইন এসেছে। বিমান এসেছে, তাই আকাশপথ নিয়ন্ত্রণের আইন এসেছে। কম্পিউটার এসেছে, তাই সাইবার আইন এসেছে। ইন্টারনেট এসেছে, তাই তথ্য, গোপনীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন হয়েছে।
এআইও সেই ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বেশি মানুষের কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে, তত বেশি নতুন প্রশ্ন সামনে আসবে। এআই দিয়ে তৈরি কোনো ভুল তথ্যের দায় কার? কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অ্যালগরিদম বৈষম্যমূলক ফল দিলে দায় কার? মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে একটি মডেল তৈরি হলে সেই তথ্যের অধিকার কার? এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি, সংগীত বা আবিষ্কারের মালিক কে? কোনো প্রতিষ্ঠানে এআই মানুষের কাজের বড় অংশ করে দিলে শ্রমিকের অধিকার কী হবে?
এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর এখনো বিশ্বব্যাপী বিকাশমান। অর্থাৎ, নতুন হাতিয়ার ইতিমধ্যে মানুষের হাতে চলে এসেছে, কিন্তু সেই হাতিয়ারকে ঘিরে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও আইনি কাঠামো এখনো অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হওয়ার পথে।
এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে, হাতিয়ার আগে আসে, আইন অনেক সময় পরে আসে।
মানুষ প্রথমে আগুন ব্যবহার করেছে, পরে আগুন নিয়ন্ত্রণের সামাজিক নিয়ম তৈরি করেছে। মানুষ ধাতু দিয়ে অস্ত্র বানিয়েছে, পরে যুদ্ধ ও অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম তৈরি হয়েছে। শিল্পবিপ্লব প্রথমে শ্রমের ধরন বদলেছে, পরে শ্রম আইন শক্তিশালী হয়েছে। একইভাবে এআইও আগে সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে; এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন, নৈতিকতা ও সামাজিক কাঠামো সময়ের সঙ্গে আরও পরিণত হবে।
তবে এআইয়ের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু মানুষের হাতের শক্তি বাড়াচ্ছে না, মানুষের মস্তিষ্কের কাজের কিছু অংশও গ্রহণ করছে। অতীতের অধিকাংশ হাতিয়ার মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এআই মানুষের জ্ঞান-প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। ফলে এর সামাজিক প্রভাবও তুলনামূলকভাবে গভীর হতে পারে।
তবে এআইকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি মানুষের তৈরি একটি হাতিয়ার হিসেবেও দেখা জরুরি। কারণ এআই নিজে সভ্যতা সৃষ্টি করেনি। সভ্যতা সৃষ্টি করেছে মানুষ। এআই মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে।
মানুষই প্রশ্ন করেছে, মানুষই তথ্য দিয়েছে, মানুষই অ্যালগরিদম তৈরি করেছে এবং মানুষই ঠিক করবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কোন পথে যাবে।
প্রস্তর মানুষকে শিকার করতে সাহায্য করেছিল, ব্রোঞ্জ তাকে ধাতুর শক্তি দিয়েছিল, লোহা তাকে আরও শক্তিশালী করেছিল, বাষ্পীয় ইঞ্জিন শিল্পকে বদলে দিয়েছিল, কম্পিউটার তথ্যের জগৎ বদলে দিয়েছিল; আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জ্ঞান ও শ্রমের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতিয়ার যতই বদলাক, সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু মানুষই।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী






