এক সময় উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, ঘাঘটের অববাহিকা এবং রংপুরের ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকাগুলো ছিল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য। আজ থেকে মাত্র শতবর্ষ আগেও রংপুরের বনে-জঙ্গলে ও জলাভূমির আশপাশে বিশালদেহী ভারতীয় একশৃঙ্গ গণ্ডারের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু শতাব্দীর ব্যবধানে সেই চিরচেনা প্রানীটি এই অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রগতির নামে পরিবেশের ওপর মানুষের বেপরোয়া হস্তক্ষেপ কীভাবে একটি অঞ্চল থেকে আস্ত একটি প্রজাতিকে মুছে ফেলতে পারে, রংপুর থেকে গণ্ডারের বিলুপ্তি তার এক করুণ উদাহরণ।
রংপুরে গণ্ডারের বাস উপযোগী পরিবেশ
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তরবঙ্গ, বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর এবং জলপাইগুড়ি সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চল ঘন শালবন, বাঁশঝাড়, উঁচু ঘাস এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে পরিপূর্ণ ছিল। একশৃঙ্গ গণ্ডার প্রধানত দীর্ঘ ঘাসের জঙ্গল, প্লাবনভূমি ও কাদামাটিযুক্ত আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে। রংপুরের নদীকূলের নল-খাগড়ার বোন এবং দলদলে জমিগুলো ছিল গণ্ডারের খাদ্য সংগ্রহ, বংশবৃদ্ধি এবং নিরাপদে চলাচলের আদর্শ আবাসস্থল।
বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস ও বিলুপ্তির প্রধান কারণসমূহ
রংপুর অঞ্চলের বুক থেকে গণ্ডার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ কাজ করেছে।
আবাসস্থল বিনাশ ও বনাঞ্চল ধ্বংস
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে কৃষিভূমির বিস্তার ও জনবসতি দ্রুত বাড়তে থাকে। বন কেটে কৃষিজমি তৈরি এবং কাঠ সংগ্রহের ফলে গণ্ডারের স্বাভাবিক আবাসস্থল খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়।
বেপরোয়া শিকার ও রাজকীয় ক্রীড়া
ব্রিটিশ আমলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, স্থানীয় জমিদার ও রাজপরিবারের সদস্যদের কাছে গণ্ডার শিকার ছিল অত্যন্ত অভিজাত একটি শখ। রংপুরের জমিদার ও কোচবিহারের রাজ পরিবারের নথিপত্রে প্রচুর গণ্ডার শিকারের উল্লেখ পাওয়া যায়। অবাধে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গণ্ডার নিধন এই অঞ্চলের গণ্ডার জনসংখ্যাকে দ্রুত কমিয়ে আনে।
গণ্ডারের খড়্গের বাণিজ্য
গণ্ডারের খড়্গ (Horne) নিয়ে প্রচলিত নানা লোকবিশ্বাস এবং এর উচ্চ অর্থনৈতিক মূল্যের কারণে চোরাশিকারিদের উপদ্রব বাড়ে। অলংকার, ঐতিহ্যবাহী ওষুধ এবং কথিত গুণের আশায় গণ্ডার হত্যা চরম আকার ধারণ করে।
কৃষি ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন
তিস্তা অববাহিকা এবং আশেপাশের জলাভূমি শুকিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার, বাঁধ নির্মাণ ও জনপদের অবকাঠামোগত উন্নতির ফলে গণ্ডারের চলাচলের পথ এবং দলদলে বিচরণক্ষেত্রগুলো একে একে ধ্বংস হয়ে যায়।
ধীরগতির বংশবৃদ্ধি
গণ্ডারের প্রজনন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। একটি স্ত্রী গণ্ডার কয়েক বছর পরপর মাত্র একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। তাই যে হারে এদের হত্যা করা হয়েছে বা আবাসস্থল হারিয়েছে, সেই হারে নতুন গণ্ডার জন্ম নিতে পারেনি।
পরিশেষে বলতে হয়, রংপুরের বুক থেকে গণ্ডারের চিরতরে হারিয়ে যাওয়া কেবল একটি সুনির্দিষ্ট প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, বরং তা ছিল আমাদের স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের বড় ধরনের বিপর্যয়। একসময় যা রংপুর অঞ্চলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও বন্যপ্রাণীর প্রাচুর্যের অংশ ছিল, আজ তা কেবল ইতিহাস ও নথিপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ। রংপুরের গণ্ডার হারানোর এই ইতিহাস আজকের যুগে আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা, প্রকৃতি ও বনজ প্রাণীদের সংরক্ষণ না করলে আগামীতে হয়তো আরও অনেক প্রজাতিকে আমাদের এভাবে চিরতরে হারাতে হবে।
অতঃএব আসুন বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণে আগ্রহী হই, রংপুর তথা উত্তরবঙ্গে যেন আর কোন প্রাণী বিলুপ্তির পথে না যায় সে বিষয়ে সচেনত হই ও অন্যদের সচেন করি।
প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে জনসংখা নিয়ন্ত্রন ও বনজঙ্গল ধ্বংস না করি।
সূত্র: Rakib AL Mim এর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহীত






