পৃথিবীটা কি শুধু মানুষের? উত্তরটা নিশ্চয়ই না। মানুষের পাশাপাশি এই গ্রহে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে অসংখ্য প্রাণীরও। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখা, উদ্ভিদের পরাগায়ন, বীজের বিস্তার ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ পরিবেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে প্রাণীরা। অথচ বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, নির্বিচারে শিকার, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীজুড়ে হুমকির মুখে পড়ছে বহু প্রজাতির অস্তিত্ব।
আজ ৪ অক্টোবর, বিশ্ব প্রাণী দিবস। প্রাণীদের অধিকার রক্ষা, কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সিই দ্য ওয়ার্ল্ড থ্রু দেয়ার আইজ’, যার অর্থ ‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’। প্রতিপাদ্যটি মানুষকে অন্য প্রাণীর দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীকে দেখার এবং তাদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানায়।
দিবসটির ইতিহাস শতাব্দীপ্রাচীন। ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিনে জার্মান লেখক ও প্রাণী অধিকারকর্মী হাইনরিখ জিমারমেনের উদ্যোগে প্রথম বিশ্ব প্রাণী দিবস পালিত হয়। পরে ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে পরিবেশবিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যভিত্তিক নেচার ওয়াচ ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রাণী কল্যাণমূলক সংগঠন দিবসটি পালন করে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীর ভূমিকা
পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে প্রতিটি প্রাণীরই রয়েছে নিজস্ব ভূমিকা। ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বিশাল হাতি কিংবা তিমি, প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখে। একটি প্রজাতির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে কিংবা সেটি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ওপর।
খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখতে প্রাণীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তৃণভোজী প্রাণী উদ্ভিদ খেয়ে বেঁচে থাকে, আর মাংসাশী প্রাণী শিকার করে তৃণভোজীসহ অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
কৃষি ও উদ্ভিদের বংশবিস্তারের ক্ষেত্রেও প্রাণীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। মৌমাছি, প্রজাপতি, বাদুড় ও কিছু পাখি ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে। অন্যদিকে বানর, পাখি ও কাঠবিড়ালির মতো প্রাণী ফল খাওয়ার পর বীজ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়। এতে নতুন উদ্ভিদের জন্ম ও বনাঞ্চলের বিস্তারে সহায়তা হয়। আবার ব্যাঙ, মাকড়সা ও বিভিন্ন পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে বালাই নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
মৃত প্রাণী ও জৈব বর্জ্য পচিয়ে পরিবেশে পুষ্টি উপাদান ফিরিয়ে দেওয়ার কাজেও প্রাণী ও অণুজীবের ভূমিকা রয়েছে। শকুন, কাকসহ মৃত প্রাণীভোজী বিভিন্ন প্রাণী মৃতদেহ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। কেঁচো ও মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন জীব মাটির গঠন ও পুষ্টি চক্র সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। এসব প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে পরিবেশের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রাণীজগতেও বাড়ছে ঝুঁকি
জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশেও প্রাণী সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবন, পাহাড়ি বন, নদী, হাওর, বিল ও অন্যান্য জলাভূমি অসংখ্য বন্যপ্রাণী ও পাখির আবাসস্থল। রয়েল বেঙ্গল টাইগার (বাঘ), হরিণ, বানর, কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে বনভূমি ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, নদীদূষণ, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে এসব প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। মানুষের বসতি, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্রও খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। এতে খাবার সংগ্রহ, প্রজনন ও নিরাপদে চলাচলের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
শুধু বন্যপ্রাণী নয়, শহর ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীও মানুষের নিষ্ঠুরতা, অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে আহত বা অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় না। প্রাণীর প্রতি এমন আচরণ বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রাণী বিলুপ্তির আশঙ্কা
বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি পরিবেশ সংরক্ষণবিদদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বে পর্যবেক্ষণ করা বন্যপ্রাণীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর গড় আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ৩১ প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে গেছে এবং অন্তত ২১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিপন্ন। এসব প্রজাতির মধ্যে উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। তবে প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়া এবং কোনো প্রজাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয় দুটি আলাদা; এ ধরনের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে গবেষণার সময়কাল ও তথ্যের উৎস বিবেচনা করা জরুরি।
প্রাণীদের অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যৎও গভীরভাবে জড়িত। কোনো প্রাণী বিলুপ্ত হলে শুধু একটি প্রজাতিই হারিয়ে যায় না, তার সঙ্গে সম্পর্কিত খাদ্যশৃঙ্খল, পরাগায়ন, বীজের বিস্তার কিংবা পুষ্টি চক্রের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয় নয়, বরং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, সুস্থ পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণী সুরক্ষায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার বন্ধ করা, বন ও জলাভূমি রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং আহত প্রাণীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ শেখানো জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীকে ধরে পোষা, আবাসস্থল ধ্বংস করা কিংবা বিনোদনের নামে প্রাণীকে নির্যাতন করার মতো আচরণ থেকেও বিরত থাকতে হবে।
বিশ্ব প্রাণী দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়; এই গ্রহে প্রতিটি প্রাণীরই প্রকৃতিতে নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। প্রাণীদের নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিত করা, তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা এবং সব জীবের প্রতি সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই দিবসটির তাৎপর্য বাস্তবায়ন সম্ভব।






