বাংলাদেশে প্রাণী অধিকার কতটুকু সংরক্ষিত হচ্ছে?

লেখা: ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

বিনোদনের নামে প্রাণীদের ওপর যে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয় তা নিয়ে একটি চমৎকার ও শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র ‘ফার্দিন্যান্ড’। ২০১৭ সালে প্রকাশ পাওয়া এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছিল একটি শান্তিপ্রিয় ষাঁড়কে জোর করে স্পেনের নিষ্ঠুর ষাঁড়ের লড়াইয়ে নামানো হয়েছিল। আমরা ছোটোবেলায় যে সার্কাস দেখেছিলাম, সেই সার্কাসগুলোতে যে হাতি, ভালুক দেখানো হতো; আমরা হয়ত জানিই না এই আনন্দের আড়ালে পশুপাখিটির কোন কান্না জড়িয়ে আছে।

২০২৪ সালে ঢাকার জাপান গার্ডেন সিটিতে ১০টি কুকুরকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়। পাবনার ঈশ্বরদীতে সদ্যোজাত ৮টি কুকুর ছানাকে বস্তা বন্দী করে পুকুরে ডুবিয়ে মারা হয়। সম্প্রতি কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

গার্ডেন সিটির ওই ঘটনায় বাসিন্দারা রাত ৯টার দিকে হঠাৎ কয়েকটি কুকুর ও একটি বিড়ালকে যন্ত্রণায় দিগইবদিক ছোটাছুটি করতে দেখেন। এসব প্রাণীগুলো সেখানে রক্তবমি করতে করতেই চোখের সামনেই মারা যায়। পুলিশ পরে তিনটি কুকুর ও একটি বিড়ালের মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় মামলাও হয়। পুলিশ কুকুর -বিড়াল হত্যার সত্যতা পেলেও আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ঈশ্বরদির ঘটনায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বাদী হয়ে প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯ এর ৭ ধারায় থানায় মামলা করেন। এতে আসামিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৬ সালের ২৪ জুন নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে একটি জীবন্ত কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়। ২৫ জুন ২০২৬ সালে অভিযুক্তসহ কয়েকজনকে পুলিশ আটক ও গ্রেপ্তার করে।

প্রাণী অধিকার একটি নৈতিক ও দার্শনিক ধারণা। এই ধারণার মূল কথা হলো পশু-পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদেরও মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এটি প্রাণীর প্রতি সহানুভূতির বিষয় শুধু নয়; এটি তাদের অধিকার। আইনগত অধিকারও বটে।

প্রাণী অধিকারের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয় কোনো কষ্ট দেওয়া বা নির্যাতন করা অনৈতিক। প্রাণীরা যেন স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারে। প্রাণীদের যে স্বাভাবিক আনন্দ আছে সেই আনন্দেই যেন তারা বেঁচে থাকতে পারে। কেউ চাইলেই তাকে হত্যা করতে পারে না। বিভিন্ন বিনোদন, সার্কাস, পশপাখির লড়াই প্রভৃতি জায়গায় প্রাণী নির্যাতন করা যাবে না। প্রসাধন বা ওষুধ পরীক্ষার নামেও প্রাণীদের ওপর নির্যাতন করা যাবে না। খামারগুলোতে গবাদিপশুর ওপর নির্যাতন করা অপরাধ। পোষা প্রাণীদের প্রতি অবহেলা, পরিত্যাগ বা নির্যাতন এসবও রোধ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী বেওয়ারিশ কুকুর নিধন বা অপসারণ আইনত দণ্ডনীয়। এই আইনের ১০ ও ১১ নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বেওয়ারিশ প্রাণী হত্যা করতে পারবে না। কুকুরের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ বা বিষ প্রয়োগ করে মারা গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হবে। কুকুর ব্যবস্থাপনায় নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইনি নোটিশও করা হয়েছে। তবে জননিরাপত্তায় ত্রুটি থাকলে কুকুর অপসারণ বা স্থানান্তর করা যেতে পারে।

২০২৫ সালে কুকুর ইস্যুতে ভারতের নয়াদিল্লীতে তোলপাড় শুরু হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সম্প্রতি একটি আদেশ দেয়া হয় যেখানে বলা হয় নয়াদিল্লির রাস্তায় কোনো কুকুর থাকবে না। তাদেরকে আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হবে। নয়াদিল্লিতে জলাতংকে মৃত্যুর ঘটনায় এমন সিদ্ধান্ত দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া গেটে জমায়েত হয় প্রাণীপ্রেমী ও প্রাণী অধিকার কর্মীরা। তাদের মতে এলাকায় থাকা রাস্তার কুকুর সরিয়ে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং জন্মনিয়ন্ত্রণ, টিকাদান ও বন্ধ্যাত্বকরণের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

যদিও আদালত কুকুরদের সরানোর কাজে বাধা দিলে বা কুকুরদের ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা নজরে আসলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে। তবে প্রাণীর স্বাভাবিক বিকাশ, পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিবেচনায় আদালতের এমন সিদ্ধান্ত ছিল নেতিবাচক।

প্রতিবছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস পালিত হয়। এই দিবসের লক্ষ্য হলো বিশ্বের সকল প্রাণীদের অধিকার, কল্যাণ ও সুরক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। মূলত এই দিবসটি প্রথম পালন করা হয়েছিল ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ। জার্মান লেখক ও প্রাণী অধিকার কর্মী হেনরিক জিম্মারম্যান প্রথম এই দিবসটি পালন করেন। পরে ১৯২৯ সালের ৪ অক্টোবর থেকে পশুপাখি রক্ষক সেন্ট ফ্রান্সিস অফ অ্যাসিসি ভোজ উৎসবের দিন এ দিবস পালন করা শুরু হয়।

প্রথমদিকে এটি কেবল জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড ও চেকো শ্লোভোকিয়ায় পালিত হয়। পরে ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা কংগ্রেসে দিবসটি পালনের প্রস্তাব উত্থাপন হলে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

বাংলাদেশে প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯-এ প্রাণীদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া, গায়ে আঘাত করা, না খাইয়ে রাখা, অতিরিক্ত বোঝা চাপানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাস্তায় বা মালিকবিহীন প্রাণীদের বিনা কারণে হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পোষা প্রাণীর বাণিজ্যিক খামার পরিচালনার জন্য নিবন্ধন ও নিয়মনীতি মেনে চলার ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। এসব লঙ্ঘন করলে নির্দিষ্ট মেয়াদের জেল ও জরিমানার বিধান আছে।

কিন্তু এসব আইন থাকা সত্ত্বেও সচেতনতার অভাব ও সঠিক প্রয়োগের অভাবের কারণে পশুপাখির ওপর নির্যাতন ও অবহেলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। এই ক্ষেত্রে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। কেননা আমরা অনেকেই প্রাণী অধিকার বিষয়ে সচেতন নই।

লেখক: পরিবেশ বিষয়ক লেখক

আরও পড়ুন

কুকুরের প্রতি বিদ্বেষের উৎস কোথায়?

লেখা: মো. আবু নাসের বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পথকুকুরকে খাবার দেওয়া বা চিকিৎসা করানো মানুষদের নিয়ে কটূক্তি, হুমকি, অপমান ও শারীরিক হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। সামাজিক...
বিশেষ মতামত
0
minutes

হাতিয়ার যখন পৃথিবী বদলের হাতিয়ার

লেখা: উত্তম কুমার ঘোষ মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত হাতিয়ারের ইতিহাস। যে মানুষ একদিন পাথরের টুকরো ধারালো করে শিকার ধরেছিল, সেই মানুষই আজ এমন এক হাতিয়ার...
বিশেষ মতামত
0
minutes

করম পরব: গাছ, বীজ ও মানুষের জীবনের বন্ধনের নাম করম

রাঢ় বাংলার মানভূম থেকে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, অসম, বাংলাদেশ — বিভিন্ন অঞ্চলে আজ করমের আচার পালিত হচ্ছে।  কোথাও রূপ বদলেছে, কোথাও গান...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

রংপুরের গণ্ডার: একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের হারানো ইতিহাস

এক সময় উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, ঘাঘটের অববাহিকা এবং রংপুরের ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকাগুলো ছিল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য। আজ থেকে মাত্র শতবর্ষ আগেও রংপুরের বনে-জঙ্গলে ও...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes
spot_imgspot_img