পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে চারদিকে সবুজের সমুদ্র, দূরে পাহাড়ের সারি, কোথাও মেঘের ভেলা, কোথাও গভীর খাদ। নিচে ঝিরি-ছড়া, ঝরনার কলকল শব্দ। বান্দরবানের এই অপরূপ প্রকৃতিই পর্যটন ব্যবসার সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই সৌন্দর্যকে ঘিরেই পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, কটেজ ও মাচাংঘর।
পাহাড়ের চূড়া, ঢাল, কিনারা কিংবা গাছপালাহীন টিলায় গড়ে উঠছে রং-বেরঙের স্থাপনা। নাম দেওয়া হচ্ছে ‘ইকো রিসোর্ট’। কিন্তু পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ধারণার সঙ্গে এসব স্থাপনার বাস্তবতার রয়েছে বিস্তর ফারাক। কোথাও প্রাকৃতিক ঢাল কেটে তৈরি হয়েছে সড়ক ও স্থাপনার জায়গা, কোথাও নেই পরিকল্পিত বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা। ফলে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে গিয়ে প্রকৃতির ওপরই বাড়ছে চাপ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও জমির কাগজপত্র রয়েছে, কোথাও তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। অনেক ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো স্থাপনা চলছে শুধু ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ে রিসোর্ট ব্যবসা চলছে।
কোথাও রাবার বাগান বা উদ্যানতত্ত্বের নামে লিজ নেওয়া জমিতে গড়ে উঠেছে পর্যটন স্থাপনা। আবার কোথাও সরকারি খাস পাহাড় দখল করে রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে বান্দরবানের পাহাড়ে পর্যটন ব্যবসার বিস্তার ঘটলেও এর বৈধতা, পরিবেশগত প্রভাব ও নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
পাঁচ শতাধিক স্থাপনা, অনুমোদন মাত্র ৭৯টির
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ে পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও মাচাংঘর গড়ে উঠেছে। অথচ জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, অনুমোদিত হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা ৭৯। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৩২টির। ফলে বিপুলসংখ্যক স্থাপনার বৈধতা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
সম্প্রতি বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়া ও ঢালের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়- এমন জায়গাগুলোই রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রধান আকর্ষণ। কোথাও পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে তৈরি হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ মাচাংঘর, কোথাও ইট-কংক্রিটের স্থাপনা, আবার কোথাও বাঁশ, কাঠ ও ছন দিয়ে তৈরি কটেজ। সামান্য জায়গা পেলেই নির্মাণ করা হচ্ছে টংঘর।
এসব কটেজে অবস্থান করতে পর্যটকদের প্রতি রাতের ভাড়া গুনতে হয় পাঁচ হাজার থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে ভাড়া নির্ধারিত হয়। বাঁশ, ছন ও টিনের ছোট মাচাংঘরের ভাড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় পর্যটন বাণিজ্য।
মিরিঞ্জায় রিসোর্টের ছড়াছড়ি
লামার মিরিঞ্জা এলাকায় রিসোর্টের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। মিরিঞ্জা ভ্যালি রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান বলেন, এলাকায় প্রায় ৮৯টি রিসোর্ট রয়েছে। এসবের অনেকগুলো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছে। তবে অনেকেরই পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন কিংবা ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।
লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রফিক বলেন, ‘এখানে মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে, তার হিসাব আমাদের কাছেও নেই। সমিতি থাকলেও কেউ কারো কথা শুনছে না।’
রিসোর্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তথ্যমতে, মিরিঞ্জা পাহাড় এলাকার অনেক জমি বিভিন্ন সময়ে রাবার বাগান করার জন্য লিজ নেওয়া হয়েছিল। পরে কোনো কোনো জায়গায় জুমঘর বা ছোট কাঠামো নির্মাণ করে পর্যটকদের আকর্ষণ করা শুরু হয়। কোথাও কোথাও সরকারি খাস পাহাড় দখল করে রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।
পাহাড়, বন ও পানির ওপর বাড়ছে চাপ
পরিবেশবিদ উয়ই সিং বলেন, পাহাড় কাটা, গাছ কাটা এবং ঝিরি-ছড়া ভরাটের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। রিসোর্টের বর্জ্য নদী-নালা ও ঝিরিতে মিশে পানি দূষিত করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান শাখার সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, গত কয়েক বছরে বড় বড় পাহাড়ের চূড়ায় একের পর এক ‘ইকো’ নামের রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। অনেকগুলোরই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেই। এভাবে চলতে থাকলে কটেজের নামে পাহাড়ি এলাকা অপরিকল্পিতভাবে ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ জন্য দ্রুত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
বর্জ্য যাচ্ছে ঝিরিতে, দূষিত হচ্ছে পানির উৎস
রিসোর্টগুলোর বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থাপনায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট পড়ে থাকছে পাহাড়ের ঢাল, খাদ ও ঝিরির পাশে। কোথাও কোথাও বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
লামার ইয়াংছা পাড়ার বাসিন্দা মংচিং মার্মা জানান, রিসোর্টের বর্জ্য ঝিরি ও ছড়ায় গিয়ে পড়ায় তাঁদের একমাত্র পানির উৎস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। রান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে বাধ্য হয়ে সেই পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
অগ্নিনিরাপত্তায়ও ঝুঁকি
মিরিঞ্জাসহ নতুন পর্যটন এলাকাগুলোর অনেক রিসোর্ট ও কটেজ নির্মিত হয়েছে কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিন দিয়ে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোতে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নেই। দুর্গম পাহাড়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের উপযোগী সড়কও অনুপস্থিত।
বান্দরবান জেলা ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুল মান্নান আনসারী বলেন, জেলায় ঠিক কতটি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে প্রায় ৬০টি হোটেল-রিসোর্ট ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নবায়ন করেছে।
তিনি বলেন, কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিনের তৈরি অনেক কটেজে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নেই। দুর্গম পাহাড়ে অগ্নিনির্বাপণ যান চলাচলের উপযোগী সড়ক না থাকায় আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, জেলায় ৩২টি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। তবে আইনি কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
পর্যটন খাতে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির আলোকে ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে স্থানীয় পর্যটন খাত হস্তান্তর করা হয়। তবে এক যুগ পার হলেও পর্যটন স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনায় জেলা পরিষদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাম্যাচিং। তবে পর্যটনশিল্পের বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করেন জেলা পরিষদ সদস্য লুসাই মং মারমা। তিনি বলেন, পর্যটনশিল্পের প্রসারে বিদ্যমান বাধা দূর করতে প্রশাসন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে জেলা পরিষদ।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশন বা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আলাদা স্থানীয় কার্যালয় নেই। ফলে হোটেল-রিসোর্টের বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও পার্বত্য জেলা পরিষদ দেখভাল করে।
জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমানে ৭৯টি হোটেল ও রিসোর্ট অনুমোদন নিয়েছে। বাকি হোটেল-রিসোর্টগুলোকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার জন্য অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ের সৌন্দর্যকে ঘিরে বান্দরবানে পর্যটন ব্যবসা বাড়ছে। কিন্তু অনুমোদনের অস্পষ্টতা, পাহাড় কাটা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি দেখিয়ে দিচ্ছে, পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে, অপরিকল্পিত স্থাপনার চাপে সেই সৌন্দর্যই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ






