ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার বিস্তার কোথায় বাড়ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাঁদে ধরা মশা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে শনাক্ত করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। এ কাজ সহজ করতে শব্দের সাহায্যে মশা আকর্ষণ, ক্যামেরায় ছবি ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে মশা শনাক্ত ও গণনা করতে সক্ষম একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামের যন্ত্রটি ফাঁদে আটকে পড়া মশার ছবি তুলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী সার্ভারে পাঠায়। সেখানে এআই মডেলের সাহায্যে মশা শনাক্ত ও গণনা করা হয়। পরে এসব তথ্য ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। ফলে দূর থেকেই কোনো এলাকায় মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব, অধ্যাপক সাঈদ মাহমুদ উল্লাহ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আশফাকুল মুঈদের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট-এ প্রকাশিত হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে যন্ত্রটি
স্ত্রী এডিস মশার ডানার কম্পন থেকে তৈরি শব্দ পুরুষ এডিস মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে গবেষকেরা যন্ত্রটিতে ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্টজের পরিবর্তনশীল শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করেছেন।
যন্ত্রের ভেতরে থাকা পাখা মশাকে টেনে নেয়। এরপর আঠাযুক্ত পৃষ্ঠে আটকে পড়া মশার ছবি তোলে ক্যামেরা। ছবিতে মশা শনাক্ত করার সুবিধার্থে ব্যবহার করা হয়েছে হলুদ পটভূমি ও নির্দিষ্ট আলোর ব্যবস্থা।
পরে ছবিগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে ‘ইয়োলোভি১১’ নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল ছবিতে থাকা এডিস ও অন্যান্য প্রজাতির মশা শনাক্ত এবং গণনা করে। এসব তথ্য ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যন্ত্রটি শব্দের সাহায্যে মূলত পুরুষ এডিস মশাকে আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে, ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় সংক্রমিত স্ত্রী এডিস মশা। তাই পুরুষ এডিসের উপস্থিতি মশার বিস্তারের প্রাথমিক সংকেত দিতে পারে, কিন্তু শুধু এই তথ্য দিয়ে কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
পরীক্ষায় মিলেছে কী ফল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা উদ্যানে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় প্রতিবার ৩০টি এডিস ও ৩০টি কিউলেক্স মশা ব্যবহার করা হয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করা যন্ত্রটি শব্দহীন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তুলনায় গড়ে পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছিল। শব্দ ব্যবহার করা যন্ত্রে ধরা মশার ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল এডিস।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিনের প্রাথমিক মাঠ পরীক্ষা চালানো হয়। এ সময় শব্দ ব্যবহার করা যন্ত্রে ৪৯টি এডিস ও ১০টি অন্য প্রজাতির মশা ধরা পড়ে। অর্থাৎ, ধরা পড়া মশার ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ ছিল এডিস। অন্যদিকে, শব্দহীন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে একটি এডিস ও তিনটি অন্য প্রজাতির মশা ধরা পড়ে।
তবে মশা ধরতে পারা আর সেগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারা এক বিষয় নয়। মাঠপর্যায়ে ধরা পড়া ৪৯টি এডিস মশার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলটি ৩৫টিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। শনাক্তের হার ছিল ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাতাসে উড়ে আসা ময়লা ও বৃষ্টির ফোঁটা ছবিতে বাধা তৈরি করেছে। এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে মাঠপর্যায়ের আরও ছবি দিয়ে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ এবং শনাক্তকরণে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
উপকারী পোকা রক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে
যন্ত্রটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, নির্দিষ্ট প্রজাতির মশা শনাক্ত করার উপযোগী করে এর কার্যক্রম সাজানো যায়। এতে লক্ষ্যবস্তু নয়, এমন পোকা ধরার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আশফাকুল মুঈদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্ত্রী মশা যেভাবে শব্দ করে, পুরুষ মশা সেভাবে করে না। এ শব্দ তারা করে মূলত পাখার মাধ্যমে। আমরা স্ত্রী মশার শব্দ সংগ্রহ করেছি। এ যন্ত্রে সেই শব্দ বাজতে থাকবে। দূর থেকে, এমনকি মুঠোফোনের মাধ্যমে এর গতিবিধি আমরা দেখতে পাব। এই যন্ত্রে এমনভাবে প্রোগ্রাম ঠিক করা হয়েছে, যাতে অন্য কোনো পোকা বা মশা নির্দিষ্ট করা যায়। তাতে অন্য উপকারী পোকা মারা যাবে না।’
অর্থাৎ, প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাঁদে ধরা মশা সংগ্রহ করে আলাদাভাবে শনাক্ত করার যে কাজ করতে হয়, এই যন্ত্রে তার একটি বড় অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
যন্ত্র তৈরিতে খরচ কত
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, যন্ত্রটির যন্ত্রাংশের খরচ প্রায় ৯৯ মার্কিন ডলার। দূরবর্তী সার্ভার ব্যবহারে মাসে আরও প্রায় ১৩ ডলার ৫০ সেন্ট ব্যয় হয়। একাধিক যন্ত্র একই সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে প্রতিটি যন্ত্রের জন্য সার্ভার পরিচালনার খরচ কমতে পারে।
গবেষকেরা ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি যন্ত্র বসিয়ে পরবর্তী মাঠপরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করেছেন। বৃহত্তর পরিসরে ও দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা চালানোর মাধ্যমে যন্ত্রটির নির্ভরযোগ্যতা এবং মশার উপস্থিতির সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকির সম্পর্ক যাচাই করা হবে।
সিটি করপোরেশনের আগ্রহ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস গবেষণাটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যন্ত্রাংশের খরচ তুলনামূলকভাবে কম, এটি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এবং এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। মুঠোফোনের মাধ্যমেও যন্ত্রটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট স্থানে পরিচালিত গবেষণার ফল বৃহত্তর শহরাঞ্চলেও একই রকম হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইমরুল কায়েস বলেন, ‘কাজটি নতুন। এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কোনো সহযোগিতা বা পরামর্শের প্রয়োজন হলে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তা করতে রাজি আছে। সার্বিকভাবে কাজটিকে স্বাগত জানাই।’
গবেষক খন্দকার আশফাকুল মুঈদও জানিয়েছেন, বর্তমান পর্যায় থেকে গবেষণাটিকে আরও সম্প্রসারণ করা হবে। বড় পরিসরে মাঠপরীক্ষার পাশাপাশি যন্ত্রটিতে আরও কিছু বৈশিষ্ট্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কতটা কাজে আসবে
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার বিস্তার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ংক্রিয়ভাবে মশা শনাক্ত ও গণনা করতে সক্ষম যন্ত্র কার্যকর প্রমাণিত হলে কোনো এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া সহজ হতে পারে। এতে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম কোথায় জোরদার করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণেও সহায়তা মিলতে পারে।
তবে প্রাথমিক পরীক্ষার ফলকে এখনই ব্যাপক কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন আবহাওয়া, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং ভিন্ন পরিবেশে যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে এডিস মশার উপস্থিতির তথ্যের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সম্পর্কও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
যন্ত্রটি তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সম্ভাবনাময় একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ। তবে এর প্রকৃত উপযোগিতা নির্ভর করবে বৃহত্তর মাঠপরীক্ষার ফল, শনাক্তকরণের নির্ভুলতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে নিয়মিত ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর।






