ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে বিপজ্জনক মাত্রায় ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। পনিরে সিসার পরিমাণ নির্ধারিত নিরাপদ সীমার ৩৯ গুণ বেশি। দীর্ঘদিন এসব দূষিত পণ্য গ্রহণ করলে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা পূরণে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক, সব বয়সী মানুষের খাদ্যতালিকায় এসব পণ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তবে পুষ্টির অন্যতম উৎস এ খাদ্যপণ্যই এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া দুধ, দই, পনিরসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যে ১৪ ধরনের ভারী ধাতু এবং মলবাহিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পেয়েছেন গবেষকরা। তাদের মতে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে।
গত আগস্টে ‘ডুয়াল বারডেন অব কেমিক্যাল অ্যান্ড মাইক্রোবায়াল হ্যাজার্ডস ইন ডেইরি প্রডাক্টস ফ্রম ঢাকা, বাংলাদেশ: আ কমপ্রিহেনসিভ ফুড সেফটি অ্যাসেসমেন্ট অ্যাক্রস মার্কেট সিস্টেম’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার (বিসিএসআইআর) চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর), সেন্টার ফর অ্যানালাইটিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটিজ (সিএআরই) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের (সিএআরএস) গবেষকরা।
পনিরে সিসার মাত্রা নিরাপদ সীমার ৩৯ গুণ
গবেষণায় দুধ সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের দূষণ চিহ্নিত করতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত, দুই ধরনের দুগ্ধ বাজারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। খামার, হকার, স্থানীয় বাজার এবং বাণিজ্যিক বিক্রয়কেন্দ্র থেকে মোট ৮৪টি নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকরা।
নমুনার মধ্যে ছিল ৫০টি কাঁচা দুধ, ১২টি ফুটানো দুধ, ১০টি পনির, পাঁচটি বাণিজ্যিক দই, ১০টি রাস্তার মাঠা, পাঁচটি মিষ্টি বা টক দই এবং ঘি ও মাখনের একটি সম্মিলিত গ্রুপের পাঁচটি নমুনা। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিক্রি ও ব্যবহার, দুধ সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য পেতে শহর থেকে দূরত্ব, ক্রেতার সংখ্যা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নমুনা সংগ্রহের স্থান নির্বাচন করা হয়।
গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণে কাঁচা ও পাস্তুরিত দুধ, দই, পনিরসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যে সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ, ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম, লোহা, কোবাল্ট, অ্যালুমিনিয়াম ও ভ্যানাডিয়াম, এই ১৪ ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এসব ধাতুর মধ্যে সিসার উপস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। গবেষণায় পরীক্ষা করা প্রতিটি ধরনের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি সিসা পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি সিসা মিলেছে পনিরে।
খাদ্যে সিসার নিরাপদ সীমা প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রাম। অথচ পনিরে সিসার পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে দশমিক ৭৮৪ মিলিগ্রাম, যা নির্ধারিত সীমার ৩৯ গুণ বেশি।
একইভাবে আর্সেনিকের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম হলেও বীজ দই, কাপ দধি, মাঠা ও পনিরে এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে নির্ধারিত সীমার অনেক ওপরে। পনিরে আর্সেনিকের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি, প্রতি লিটারে প্রায় ৬২ দশমিক ৮৬ মিলিগ্রাম।
ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতিও আশঙ্কাজনক। খাদ্যে এ ধাতুর নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ১ মিলিগ্রাম। কিন্তু গবেষণায় পনিরে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ১৯ মিলিগ্রাম, কাপ দধিতে দশমিক শূন্য ১১ মিলিগ্রাম এবং বীজ দইয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ১৪ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।
পারদের সহনীয় সীমা প্রতি লিটারে দশমিক শূন্য ০১ মিলিগ্রাম। গবেষণায় কাঁচা ও ফুটানো দুধ কিংবা মাঠায় পারদের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে পনিরে প্রতি লিটারে দশমিক ১৫৭ মিলিগ্রাম এবং ঘিতে দশমিক শূন্য ৪৬ মিলিগ্রাম পারদ পাওয়া গেছে।
নিকেলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র উঠে এসেছে। এ ধাতুর অনুমোদিত সীমা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ২ মিলিগ্রাম। কিন্তু কাঁচা দুধ থেকে শুরু করে পনির পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যে নিকেলের মাত্রা ছিল নিরাপদ সীমার কয়েক গুণ বেশি। পনিরে এর পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ২ দশমিক ৫৪৫ মিলিগ্রাম।
এদিকে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ বেশির ভাগ দুগ্ধজাত পণ্যে নির্ধারিত নিরাপদ সীমা প্রতি লিটারে দশমিক ৩ মিলিগ্রাম ছাড়িয়ে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে তা সীমার কাছাকাছি ছিল। তবে তামা ও জিংকের মাত্রা মোটামুটি নিরাপদ সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দুধে ভারী ধাতু আসছে কোথা থেকে
দুধে ভারী ধাতুর উপস্থিতির উৎস সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পশুখাদ্য, ঘাস, মাটি ও পানির মাধ্যমে এসব ধাতু গরুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের (সিএআরএস) প্রিন্সিপাল বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষণা দলের সদস্য ড. আসমা রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দুধে মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতু পাচ্ছি। দুধে পাওয়া মানে দুধ থেকে তৈরি সব পণ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। গরু যে ফিড খায় সেটাতেও ভারী ধাতু থাকতে পারে। আবার গরু যেখানে ঘাস খাচ্ছে, দেখা গেল সে মাটিতে ভারী ধাতু রয়েছে। অথবা যে পানি খাচ্ছে সেটাতেও ভারী ধাতু রয়েছে। এটা স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে দুধে ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে এটা নিশ্চিত।’
দুধে ই কোলাই ও স্যালমোনেলা
ভারী ধাতুর পাশাপাশি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও পেয়েছেন গবেষকরা। ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ডের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ই কোলাই এবং স্যালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্রে সাধারণত এসব ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। এগুলো খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, বদহজমসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে।
গবেষক দলের সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুধের মধ্যে মলের জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে এটা খুব উদ্বেগজনক কথা। আমরা দেখেছি, সাভার থেকে যখন ঢাকা ও আশপাশের বাজারে দুধ নিয়ে যায় তখন বুড়িগঙ্গার পানিও এতে মেশানো হয়। গরুর মলমূত্র দুধের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে দুধ সাদা দেখা যায়, কিন্তু এখানে ই কোলাই জীবাণু কিলবিল করতে থাকে। দুধ মূলত খামার থেকেই দূষিত হয়। আর কাঁচা দুধ দূষিত হলে তা দিয়ে যা-ই বানানো হোক সেটাও দূষিতই হবে।’
দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণে বাড়তে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি
দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে নিলে এতে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করা সম্ভব। তবে ফুটিয়ে ভারী ধাতুর দূষণ দূর করা যায় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুধে ভারী ধাতু, ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়া, জন্ডিস ইত্যাদি গুরুতর অসুখ হতে পারে। তবে দুধটা ভালো করে ফুটালে এসব ব্যাকটেরিয়া মরে যায়। আর ভারী ধাতু দীর্ঘ সময় ধরে গ্রহণ করলে ব্লাড ক্যান্সারসহ নানা ধরনের ক্যান্সার, হাইপারটেনশন ইত্যাদি জটিলতা দেখা দেয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পশুখাদ্য, গবাদিপশুর পানির উৎস, খামারের পরিচ্ছন্নতা এবং দুধ সংগ্রহ ও পরিবহনের ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে পুষ্টির অন্যতম উৎস এ খাদ্যপণ্যে দূষণের ঝুঁকি থেকেই যাবে।






