এইচ এম আবু ছিদ্দিক

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চর্চার দিকে তাকালে একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে প্রায়শই জনস্বার্থের চেয়ে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ মুখ্য হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক ও প্রাকৃতিক সম্পদকে স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহারের চূড়ান্ত শিকার আজ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। বিশ্বজুড়ে উন্নত দেশগুলো যখন উপকূল রক্ষায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তখন আমাদের দেশে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতিপ্রদত্ত বালিয়াড়ি বিনাশ করে অবকাঠামো তৈরির নানা আয়োজন চলছে।
প্রকৃতির নিজস্ব সুরক্ষাবলয় হলো ‘বালিয়াড়ি’ বা ‘স্যান্ড ডিউনস’। দূর থেকে দেখলে একে নিছক বালুর ঢিবি মনে হতে পারে। তবে জলোচ্ছ্বাস ও উত্তাল ঢেউয়ের সামনে প্রথম প্রতিরোধক হিসেবে এর ভূমিকা অপরিসীম। এটি ঢেউয়ের শক্তি শুষে নেয়। ফলে লোকালয়ে নোনা পানি প্রবেশ করতে পারে না। পাশাপাশি এটি সৈকতের ক্ষয়রোধ করে এবং ভূগর্ভস্থ স্বাদু পানির ভারসাম্য বজায় রাখে। বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ, লাল কাঁকড়া ও পরিযায়ী পাখির প্রজননক্ষেত্রও এই বালিয়াড়ি।
পরিতাপের বিষয় হলো, নীতিনির্ধারকেরা পরিবেশবিদদের আকুল আবেদনে কান দিচ্ছেন না। সুগন্ধা থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি অপরিকল্পিত ও পরিবেশবিরোধী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ। সামান্য বৃষ্টিতেই পর্যটন শহরের অপূর্ণাঙ্গ ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেসে ওঠে। চারদিকে বর্জ্য ও দুর্গন্ধ ছড়ায়। কলাতলী হোটেল সাইমন হতে মেরিন ড্রাইভ পর্যন্ত সড়কটি আগে করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসব নাগরিক সমস্যার সমাধান না করে বালিয়াড়ি খুঁড়ে কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কক্সবাজারকে দুবাই বা থাইল্যান্ডের শান্ত উপকূলের সাথে মেলানো ঠিক নয়। এখানকার ১২০ কিলোমিটারের উন্মুক্ত সৈকত মূল ভূখণ্ডকে বিশাল ঢেউ থেকে রক্ষা করে। এটি প্রাকৃতিক বাফার জোন হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ১৯৯৯ সালে এই এলাকাকে ‘প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা’ (ECA) ঘোষণা করা হয়। ফলে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। ইতোমধ্যে ঝাউবাগান ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথ আটকে দিয়ে কৃত্রিম কাঠামো তৈরি করলে তা টেকসই হতে পারে না।
বিশ্বব্যাপী নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো বালিয়াড়ি পুনর্গঠনে কোটি কোটি ডলার খরচ করছে। তারা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই উপকূল রক্ষা করছে। অথচ কক্সবাজার পৌরসভার তত্ত্বাবধানে এবং জাইকার অর্থায়নে বালিয়াড়ি খুঁড়ে রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা চলছে। স্থানীয় সচেতন জনগণ ও পরিবেশবাদীরা জেলা প্রশাসকের কাছে এর লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে একটি প্রভাবশালী চক্র এই পরিবেশবিরোধী কাজকে সমর্থনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
যানজট নিরসন ও পর্যটন সুবিধার নামে বালিয়াড়ি ধ্বংস না করেও সমাধান সম্ভব। এ লক্ষ্যে চার দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হলো:
বাইপাস সড়ক সম্প্রসারণ: স্পর্শকাতর বালিয়াড়ি অক্ষত রেখে হোটেল-মোটেল জোন সংলগ্ন বাইপাস সড়কটি প্রশস্ত করা যেতে পারে।
উড়াল সড়ক নির্মাণ: সুগন্ধা ও কলাতলী হতে মেরিন ড্রাইভে প্রবেশের স্থানে বালু ভরাট করা বন্ধ রাখা দরকার। সেখানে পিলারের ওপর ‘এলিভেটেড ভায়াডাক্ট’ বা উড়াল সড়ক নির্মাণ করা যেতে পারে। এতে জোয়ার-ভাটা ও বালুর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা শ্রেয়।
প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টনী: ঢেউ ও নোনা বাতাসের প্রভাব কমাতে বালিয়াড়ি ও প্রস্তাবিত সড়কের মাঝখানে প্রচুর ঝাউগাছ ও অন্যান্য স্থানীয় উদ্ভিদ রোপণ করা দরকার।
স্বচ্ছতা ও গণশুনানি: নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের তৈরি EIA (পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন) প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। সুশীল সমাজ ও অধিবাসীদের নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে প্রকল্প চূড়ান্ত করা অপরিহার্য।
কক্সবাজার কোনো সাময়িক বাণিজ্যিক লাভ বা রাজনৈতিক তোষণের ক্ষেত্র নয়। প্রকৃতি বিনষ্ট করে কখনো টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ বালিয়াড়ি ধ্বংস করা হলে পুরো উপকূলীয় জনপদ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই কক্সবাজারের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব।
লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক, কক্সবাজার






