আকাশে বৃষ্টি নেই, তবু হড়পা বান! কীভাবে নামল জল-কাদা-পাথরের স্রোত?

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে আকাশে ছিল না ভারী বৃষ্টি। আবহাওয়া দপ্তর থেকেও জারি করা হয়নি কোনো বিশেষ সতর্কতা। দিনটি শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিব্বতের উজান থেকে তীব্র গর্জনে নেমে আসে জল, কাদা ও পাথরের এক বিধ্বংসী স্রোত। শান্ত পাহাড়ি নদী ভোতে কোশি মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় ভয়াবহ হড়পা বানে।

২৬ আগস্ট সকালে শুরু হওয়া এই আকস্মিক বিপর্যয়ে নেপালের রাসুয়া জেলা ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিব্বত সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন জনপদ, সড়ক, বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায়।

ভূমিকম্পের আধঘণ্টার মধ্যেই নামল ঢল

ঘটনার সূত্রপাত ২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

এর ঠিক আধঘণ্টার মধ্যেই তিব্বতের উজান থেকে প্রবল বেগে ঘোলা পানির স্রোত নিচের দিকে নামতে শুরু করে।

সকাল ৯টার দিকে সেই ঢল নেপালের রাসুয়া জেলায় পৌঁছে যায় এবং ভোতে কোশি নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন রাসুওয়াগঢ়ি ও তিমুরে এলাকা প্রথম ধাক্কাতেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয় কাস্টমস অফিস, দোকানপাট, বসতবাড়ি এবং পার্কিংয়ে থাকা বহু গাড়ি জলের তোড়ে ভেসে যায়।

সকাল ১০টার পর ঢল আরও নিচের দিকে নেমে সিয়াফ্রুবেসি এলাকায় আঘাত হানে। দুপুরের মধ্যে এই পানি ত্রিশূলী নদী ধরে নুওয়াকোট ও ধাডিং জেলার দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

বেত্রাবতী থেকে রাসুওয়াগঢ়ি পর্যন্ত প্রায় ৪২ কিলোমিটার পাহাড়ি সড়ক ভেঙে যাওয়ায় পুরো সীমান্ত অঞ্চলটি রাজধানী কাঠমান্ডু ও সমতল এলাকার সঙ্গে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বৃষ্টি নয়, উজানের ধস থেকেই বিপর্যয়?

এই ভয়াবহ হড়পা বানের পেছনে স্থানীয় বৃষ্টির কোনো ভূমিকা ছিল না বলে আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে।

স্যাটেলাইট তথ্য ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লহেন্দে নদীর ওপর বিশাল বরফ ও পাথরের ধস নেমেছিল।

সকালের মৃদু ভূমিকম্প পাহাড়ের আলগা বরফ ও পাথরকে নাড়িয়ে দিয়ে ওই ধস নামাতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ধসে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে নদীর উজানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়।

পানির চাপ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে সেই আলগা বাঁধ হঠাৎ ভেঙে যায়। আর তখন আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে এসে ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি করে।

পাশাপাশি তিব্বতের কোনো হিমবাহ হ্রদ ফেটে গিয়ে এই বিপুল পানি নেমেছে কি না, অর্থাৎ গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উদ্ধারকাজে বাধা দুর্গম ভূখণ্ড ও ভাঙা যোগাযোগব্যবস্থা

যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে ব্যাপক বেগ পেতে হচ্ছে।

নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে ত্রিশূলী ও দেবীঘাটসহ একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

নেপালের পাহাড়ে হড়পা বানের দীর্ঘ ইতিহাস

নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও হড়পা বানের ইতিহাস নতুন নয়।

১৯৮৫ সালে দুধ কোশি অববাহিকায় ডিগ ছো হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে প্রায় ১ কোটি ঘনমিটার পানি নিচের দিকে নেমে আসে। এতে নামচে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বহু সেতু ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯৯৩ সালে মধ্য নেপালে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ।

২০২১ সালের জুনে মেলামচি ও ইন্দ্রাবতী নদীতে পাহাড়ধস এবং জমে থাকা পানি ভেঙে নেমে আসার ঘটনায় গোটা মেলামচি বাজার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

এমনকি ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও রাসুয়া সীমান্তের একই লহেন্দে নদীতে হড়পা বান দেখা গিয়েছিল।

বাড়ছে হিমালয়ের নতুন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি

হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ের ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল ভূপ্রকৃতির কারণে এ ধরনের আকস্মিক জলস্ফীতি ও হড়পা বানের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, সীমান্তপারের নদীগুলোতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু উদ্ধার তৎপরতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। চীন ও নেপালের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, উজানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং উপগ্রহভিত্তিক আধুনিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি।

কারণ পাহাড়ের উজানে সৃষ্টি হওয়া একটি ধস, অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ বা হিমবাহ হ্রদের বিপর্যয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শত শত কিলোমিটার নিচের জনপদের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: inscript.me

আরও পড়ুন

ঘণ্টায় ২২৭ কি.মি. বেগে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী টাইফুন চামপি, ছয় মিটার...

প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী টাইফুন চামপি তাইওয়ানের দিকে এগিয়ে আসায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ঝড়টির প্রভাবে দুই শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে...
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
0
minutes

উটের চোখের পানিতে ২৬ সাপের বিষের প্রতিষেধক, দাবিটি কতটা সত্য?

উটের চোখের পানিতে এমন অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা দুই ডজনেরও বেশি প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি কৌতূহল...
জাতীয়
0
minutes

ফুটপাতের পিঠা-পুরির দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়, কার্যকর ১ নভেম্বর থেকে

সড়কের পাশে পিঠা, পুরি, ঝালমুড়ি ও পেঁয়াজু বিক্রির দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকে নিবন্ধন...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes
spot_imgspot_img