ব্যস্ত জীবনে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। শহরের কংক্রিটের ভিড়ে কাজ, পড়াশোনা কিংবা নানা দায়িত্বের চাপে অনেকেরই দিনের বড় একটি সময় কাটে ঘরের ভেতর। অথচ গবেষণা বলছে, প্রকৃতির সঙ্গে নিয়মিত কিছুটা সময় কাটানো শুধু মন ভালো রাখার অভ্যাস নয়, শরীরের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ে হাঁটা কিংবা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র ২০ মিনিট সবুজের কাছাকাছি থাকাও হতে পারে শরীর ও মনের জন্য উপকারী একটি অভ্যাস।
অফিসের ব্যস্ততার মাঝে কাছের কোনো পার্কে হাঁটা, গাছের ছায়ায় বসে দুপুরের খাবার খাওয়া, কিংবা বিকেলে বারান্দা থেকে কিছুক্ষণ গাছপালা দেখা, এসবও হতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সহজ উপায়।
প্রকৃতির কাছে গেলেই শরীর ধীর হতে শুরু করে
সবুজ গাছপালা, পাতার মৃদু শব্দ, পাখির ডাক কিংবা মাটির গন্ধ, প্রকৃতির এসব স্বাভাবিক উপাদান আমাদের শরীর ও মনকে কিছুটা শান্ত করতে পারে।
প্রকৃতির দৃশ্য ও শব্দের সংস্পর্শে স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে, যা শরীরকে অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক অবস্থায় যেতে সহায়তা করে। এ সময় রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দনের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ প্রকৃতির কাছে যাওয়া শুধু মানসিক প্রশান্তির বিষয় নয়; শরীরের ওপর জমে থাকা চাপ কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
সপ্তাহে ১২০ মিনিট সবুজের কাছে
যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে মোট অন্তত ১২০ মিনিট সবুজ পরিবেশে সময় কাটিয়েছেন, তারা নিজেদের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা তুলনামূলক ভালো বলে জানিয়েছেন।
এতে বোঝা যায়, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোকে দৈনন্দিন জীবনের একটি ছোট কিন্তু নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা যেতে পারে।
প্রকৃতি কমাতে পারে মানসিক চাপ
চাপ বা উদ্বেগের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস-সম্পর্কিত হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটানো শরীরের এই স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু প্রকৃতিকে দেখা নয়, প্রকৃতির শব্দ ও গন্ধও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গাছপালা থেকে আসা প্রাকৃতিক গন্ধ অনেকের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
গাছের গন্ধেও প্রশান্তির ছোঁয়া
পাইনসহ বিভিন্ন গাছের প্রাকৃতিক গন্ধ মানুষের কাছে আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করতে পারে। কিছু গবেষণায় প্রকৃতির এমন গন্ধের সঙ্গে শরীরের শিথিল প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
গাছ ও মাটি থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক যৌগও মানুষের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পার্কে হাঁটার সময় শুধু চারপাশের সবুজ দেখা নয়, প্রকৃতির স্বাভাবিক গন্ধ ও শব্দ উপভোগ করাও হতে পারে অভিজ্ঞতার অংশ।
প্রকৃতির সঙ্গে মাটিরও সম্পর্ক
প্রকৃতির উপকার শুধু গাছপালা দেখা কিংবা নির্মল বাতাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাটি ও উদ্ভিদের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শে থাকা বিভিন্ন অণুজীব শরীরের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে, এমন বিষয় নিয়েও গবেষণা চলছে।
বিশেষ করে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং মাটি ও উদ্ভিদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে পরিচিত হওয়ার বিষয়টি এ কারণে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সুস্থ থাকার রুটিনে সবুজ
শারীরিক ব্যায়াম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন মানসিক বিশ্রামও। আর প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো হতে পারে সেই বিশ্রামের একটি সহজ উপায়।
সপ্তাহে কয়েক দিন দুপুরের বিরতিতে ২০ মিনিট পার্কে হাঁটা, ছুটির দিনে গাছপালায় ঘেরা জায়গায় কিছুক্ষণ বসে থাকা কিংবা সন্ধ্যায় ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ ও গাছপালা দেখা, ছোট এসব অভ্যাস ব্যস্ত জীবনে মানসিক বিরতি এনে দিতে পারে।
বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে ঘরেই প্রকৃতি
প্রতিদিন বাইরে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ঘরের মধ্যেও প্রকৃতির উপস্থিতি তৈরি করা যায়। ঘরে ফুল বা ছোট গাছ রাখা, জানালার পাশে সবুজ রাখা কিংবা প্রকৃতির দৃশ্যের ছবি দেখা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্বস্তি দিতে পারে।
এমনকি কম্পিউটার বা ল্যাপটপে প্রকৃতির দৃশ্য ব্যবহার করাও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে।
২০ মিনিটের ছোট অভ্যাস
নিজের যত্ন মানেই সবসময় কঠিন ডায়েট, দীর্ঘ সময়ের ব্যায়াম কিংবা ব্যস্ত রুটিনে আরও একটি কাজ যোগ করা নয়। কখনও কখনও নিজের জন্য মাত্র ২০ মিনিট সময় বের করে প্রকৃতির কাছে যাওয়াই হতে পারে একটি সহজ ওয়েলনেস রুটিন।
এক কাপ চা হাতে গাছের নিচে বসা, পার্কে ধীরে হাঁটা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাছপালা দেখা কিংবা খোলা আকাশের নিচে কিছুক্ষণ নীরবে থাকা, এসব ছোট বিরতিই ব্যস্ত জীবনে শরীর ও মনকে থামার সুযোগ দিতে পারে।
প্রকৃতির কাছে থাকার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এর জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের মাত্র ২০ মিনিট, সবুজের সঙ্গে এই ছোট্ট সম্পর্কই হয়তো এনে দিতে পারে শরীর ও মনের জন্য কিছুটা স্বস্তি, প্রশান্তি ও ভারসাম্য।
সূত্র: বিবিসি






