মাটি একটি যৌগিক পদার্থ। এর ৪৫ শতাংশ খনিজ, ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ, ২৫ শতাংশ বায়ু এবং ২৫ শতাংশ পানি। বাঙালিরা মাটিকে ‘মা’ বলেও অভিহিত করেন। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘কুহু ও কেকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘মাটি’ কবিতায় লিখেছেন, “মাটি শুধু মাটি নয়—জীবনের দণ্ড; মাটির কণায় কণায় জীবন; মাটির মাঝেই জীবনের খেলা; মাটিই জীবনের মহাসমুদ্র।”
মাটি তৈরির দীর্ঘ ইতিহাস, সময় ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার কারণে মৃত্তিকাবিজ্ঞানীরা মাটিকে বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর বস্তু এবং অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। অথচ নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে এই অমূল্য সম্পদ দিন দিন অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। মাটি হারাচ্ছে তার উর্বরতা। কমছে ফসল ও খাদ্য উৎপাদন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছে, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক মৃত্তিকা বর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত এফএওর ‘স্ট্যাটাস অব দ্য ওয়ার্ল্ডস সয়েল রিসোর্সেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বের মাটির অবস্থা এবং এর ওপর প্রভাব ফেলছে এমন পরিবর্তনগুলোকে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুপযুক্ত কৃষিপদ্ধতির পাশাপাশি বন উজাড় ও বন ধ্বংস মাটির স্বাস্থ্য অবনতির প্রধান কারণ।
৭৬ শতাংশ জমির উর্বরতা কমেছে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ০.৮ থেকে ১.২ শতাংশের মধ্যে। এতে শুধু মাটির উর্বরতাই কমছে না, এ অঞ্চলের মাটি প্রায় প্রাণহীন হয়ে পড়ছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দেখেছে, পানির সংকট ও মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ও কৃষকদের জীবিকা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বরগুনার মাটি লবণাক্ততার কারণে সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার মতো উর্বর অঞ্চলের মাটিও অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ফসল উৎপাদনে সমস্যার মুখে পড়ছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
মাটিকে ঘিরে এমন উদ্বেগের মধ্যেই প্রতিবছর ৫ ডিসেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস’। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ দিবসটির স্বীকৃতি দেয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সুস্থ শহরের জন্য সুস্থ মাটি’।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ৭৬ শতাংশই মাঝারি থেকে অতি তীব্র মাত্রায় মাটির অবক্ষয়ের কারণে উর্বরতা হারিয়েছে। ফলে প্রতিবছর ফসল উৎপাদন প্রায় ৫৩ লাখ ৩০ হাজার টন কমছে। উৎপাদন কমার হার বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ।
প্রয়োজনের দ্বিগুণ সার
যশোর–চুয়াডাঙ্গা–কুষ্টিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষি অঞ্চল। বরিশালের পর এ অঞ্চলকে দেশের শস্যভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার কৃষকেরা ফুল ও ফলসহ বিভিন্ন প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফসল উৎপাদন করে আসছেন। তবে বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।
যশোরের মরিচ ও ফুলচাষি রহমান মিয়া বলেন, বেশি ফলনের আশায় তিনি জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। কিন্তু এরপরও প্রত্যাশিত ফলন পান না। বাজার থেকে ইচ্ছামতো সার কিনে জমিতে প্রয়োগ করেন তিনি। মাটি পরীক্ষা সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে দেওয়া ‘সুষম সার সুপারিশ কার্ড’ সম্পর্কেও তিনি জানেন না। এমনকি মাঠপর্যায়ে মোবাইল মাটি পরীক্ষাগারের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করা হয়, এ তথ্যও তাঁর জানা নেই।
একই এলাকার কৃষক মোকলেস মিয়া প্রায় দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও পানি ব্যবহার করেও তিনি লাভ করতে পারছেন না। বরং দিন দিন তাঁর উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
তিনি বলেন, জমিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগের সময় কখনো কখনো তাঁর মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, বমি ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হয়।
প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় সব জেলার কৃষকেরাই জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভূমির পরিমাণ ১ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার হেক্টরের বেশি। এর মধ্যে আবাদযোগ্য জমি প্রায় ৮৮ লাখ ২০ হাজার হেক্টর, যা মোট ভূমির প্রায় ৫৯ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ৮১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর। অন্যদিকে কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৮৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরের বেশি।
মাটিতে জৈব পদার্থ ১ শতাংশের নিচে
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাতেও মাটির দুরবস্থার একই চিত্র উঠে এসেছে। অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন বলেন, শুধু যশোর নয়, দেশের প্রায় সব অঞ্চলের মাটির অবস্থাই খারাপ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের পাশাপাশি লবণাক্ততা, মানববর্জ্য, প্লাস্টিক ও শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য মাটি ও পানি দূষিত করছে। ফলে বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বর্তমানে ১ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে গেছে।
রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের বরেন্দ্র অঞ্চলে বড় ও মাঝারি কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন। উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় কৃষকেরা বেশি ফসফেট এবং কম পটাশ ব্যবহার করেন। হাওর অঞ্চলে বোরো মৌসুমে ধান চাষে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) বা মিশ্র সার বেশি ব্যবহার করা হয়। ফলে হাওর এলাকার জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চল, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে ঐতিহ্যগতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক কৃষি সম্প্রসারণের কারণে ইউরিয়া, ডিএপি/টিএসপি, এমওপি, জিংক সালফেটসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাড়ছে। এতে পরিবেশ ও জমির ক্ষতি হচ্ছে।
জাতীয় গড় হিসাবে বাংলাদেশে ব্যবহৃত সারের ৮০ শতাংশের বেশি ইউরিয়া, ১৫ শতাংশ ডিএপি/টিএসপি এবং বাকি ৫ শতাংশ পটাশ (এমওপি), জিংক, জিপসামসহ অন্যান্য সার।
কার্ড ছাড়াই সার বিক্রি
কৃষকেরা বাজার থেকে অবাধে সার কিনে জমিতে প্রয়োগ করছেন। এতে মাটি, পানি ও প্রতিবেশব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওয়ালিউর রহমান বলেন, মাঠপর্যায়ের চাহিদার ভিত্তিতে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হয়। কার্ডধারী কৃষক ছাড়া অন্য কারও কাছে সার বিক্রি না করার বিষয়ে ডিলারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কোন কৃষক কতটুকু সার পাবেন, তা সার সুপারিশ কার্ডে উল্লেখ থাকে। এই প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্ব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক সময় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণে ডিলারদের কার্ড ছাড়াই সার, বিষ ও কীটনাশক বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়।
বাংলাদেশের মাটি প্রধানত পাঁচ ধরনের- বেলে, বেলে দোআঁশ, দোআঁশ, এঁটেল এবং এঁটেল দোআঁশ। কোন মাটিতে কোন ফসলের জন্য কী ধরনের সার প্রয়োজন, তা নির্ধারণের কাজ করে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট।
এসআরডিআইয়ের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ায় পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এসব এলাকার মাটি মূলত দোআঁশ। এই ধরনের মাটিতে ফসল উৎপাদনের জন্য যতটুকু সার প্রয়োজন, কৃষকেরা তার প্রায় দ্বিগুণ ব্যবহার করছেন। সচেতনতার অভাবে মাটির তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য, গুরুতরভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অধিকাংশ মাটি ‘প্রায় মৃত’
২০২৫ সালের বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি ‘অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়’। ৫৩ শতাংশ জমির অর্ধেক বা তার বেশি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাবিব মোহাম্মদ নাসের বলেন, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ২.৫ শতাংশের কম হলে সেটিকে মৃত মাটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এসআরডিআইয়ের সাম্প্রতিক তৈরি করা জৈব পদার্থের মানচিত্রের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ৭৮ শতাংশ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। অথচ আদর্শ মাত্রা হওয়া উচিত অন্তত ২.৫ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ মাটিই এখন উর্বরতা হারিয়ে প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ একটি আর্দ্র উপ-ক্রান্তীয় দেশ। এখানকার মাটিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর অবশিষ্টাংশ, গোবর সার, জৈব সার, সবুজ সার ও পিটের পরিমাণ খুবই কম। তাছাড়া তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে জৈব পদার্থ দ্রুত পচে যায়। ফলে মাটি শক্ত ও প্রায় প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
শ্রীলঙ্কার কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩০০ কেজি। এরপর বাংলাদেশের অবস্থান, প্রতি হেক্টরে প্রায় ২৮৯ কেজি। ভারতে এর পরিমাণ প্রায় ১৬৬ কেজি। মিয়ানমারে এই হার অনেক কম, প্রায় ২৪ কেজি।
তবে ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কা হঠাৎ রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করে দিলে দেশটিতে অর্থনৈতিক ও কৃষি সংকট তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরে দেশটি আবার বেশি পরিমাণে সার ব্যবহার শুরু করে।
ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক
অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
২০২৩ সালে কীটনাশক অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (প্যান) পাঁচটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের একটি প্যান এশিয়া প্যাসিফিক (প্যানএপি) বাংলাদেশ, ভারত, লাওস ও ভিয়েতনামে একটি জরিপ পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতে ব্যবহৃত কীটনাশকের ৯২ শতাংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে এই দুই দেশের কৃষকেরা এমন কীটনাশক ব্যবহার করছেন, যা ইউরোপে নিষিদ্ধ।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘ফোরসাইট ফর ফুড’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশের বেশি জমি কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। এসব জমি থেকে বছরে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন টন খাদ্য উৎপাদিত হয়। দেশের মোট খাদ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে আবাদি জমি থেকে। ফলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল মাটি পরীক্ষার সুবিধা
সমস্যা সমাধানের বিষয়ে এসআরডিআইয়ের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মোট ৩৪টি মাটি পরীক্ষাগার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, বিভাগীয় শহরগুলোতে আটটি, সারা দেশে ১০টি মোবাইল ল্যাবরেটরি এবং ১৫টি আঞ্চলিক গবেষণাগার রয়েছে।
কৃষকেরা যাতে প্রয়োজনের সময় সহজে মাটি পরীক্ষা করে মাটির গুণমান ও জৈবিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী সুষম সার সুপারিশ কার্ড তৈরি করতে পারেন—এটাই এসব ল্যাবরেটরির উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফসল ও মাটির ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কৃষিকাজে যুক্ত পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭। নিট আবাদি কৃষিজমির পরিমাণ ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩৪ একর।
ফলে জাতীয় চাহিদার তুলনায় এসআরডিআইয়ের মাটি পরীক্ষার সেবা অত্যন্ত সীমিত। প্রতিষ্ঠানটি দেশের ৬৪টি জেলাতেও পর্যাপ্ত সেবা পৌঁছে দিতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জেলা পর্যায়ে গবেষণাগার স্থাপন করলেও চাহিদা পূরণ হবে না। তাই প্রতিটি জেলায় স্থায়ী মাটি পরীক্ষাগারের পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মোবাইল মাটি পরীক্ষাগার থাকা প্রয়োজন। এসব ল্যাবের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন এবং ছোট-বড় সব ধরনের কৃষিজমিতে মাটি পরীক্ষার সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
মাটি বাঁচাতে জৈব কৃষির ওপর জোর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও প্রতিবেশ গবেষক বিধান চন্দ্র দাস বলেন, মাটি জড় পদার্থ হলেও একে জীবন্ত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পৃথিবীর উপরিভাগের সব উদ্ভিদ ও প্রাণী মাটির জীবনশক্তির ওপর নির্ভরশীল।
অতিরিক্ত সার ব্যবহার শুধু মাটির অবক্ষয় ঘটায় না, প্রতিবেশব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য কমে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। মাটির নিচের অণুজীব ও কীটপতঙ্গ মারা যায়। এতে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মাটির উর্বরতা কমে। একই সঙ্গে ফসল উৎপাদন কমে এবং উৎপাদন খরচ বাড়ে।
মাটিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সেগুলো পানির সঙ্গে মিশে পানি দূষিত করে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রাও কমে যায়। এতে মাছ, অন্যান্য প্রাণী, উদ্ভিদ এবং পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে।
কীটনাশকের ব্যবহার কৃষকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। পাশাপাশি গৃহপালিত প্রাণী, চারণভূমির পশু, বন্যপ্রাণী এবং উপকারী কীটপতঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষজ্ঞরা জৈব কীটনাশক বা প্রাকৃতিক কৃষিপদ্ধতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
২৫ শতাংশ ভর্তুকি জৈব সারে দেওয়ার প্রস্তাব
২০২২ সালে এসআরডিআই প্রকাশিত ‘ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে বা উর্বরতা হারিয়েছে। এটি দেশের মোট ভূমির প্রায় ৭৬ শতাংশ।
গবেষণায় মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে জৈব পদার্থের ঘাটতি, গোবর সার, জৈব সার ও সবুজ সারের অভাব এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যহীনতা ও ঘাটতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, কপার, আয়রন ও মলিবডেনাম।
বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ ৩৯১ কেজি, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় তিন গুণ। অথচ প্রায় সব কৃষকই মাটি পরীক্ষা না করে অনুমানের ভিত্তিতে সার প্রয়োগ করেন।
এসআরডিআইয়ের ওই প্রকাশনার তথ্য বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জৈব কৃষি গবেষক ও জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, সরকারের ২০১৮ সালের কৃষিনীতি কৃষিজমিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। প্রয়োজনে জৈব সার ব্যবহারে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারের জন্যও ভর্তুকি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে বাজেটে মোট সার ভর্তুকির অন্তত ২৫ শতাংশ জৈব সারের জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। এতে জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ- দুটিই সুরক্ষিত হবে।
মাটি শুধু ফসল ফলানোর মাধ্যম নয়; এটি কৃষি, খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি। অথচ অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, লবণাক্ততা, দূষণ এবং জৈব পদার্থের ঘাটতিতে সেই মাটিই আজ সংকটে। মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ, সবকিছুর ওপরই এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো






