বাঁশির সুর নয়, বুদ্ধের ডাকে ছুটে আসে হাজারো পাখি

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্পে বাঁশির সুর শুনে শহরের সব ইঁদুর ছুটে এসেছিল। তবে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে দেখা মেলে ভিন্ন এক ‘বাঁশিওয়ালার’। তার হাতে নেই কোনো বাঁশি, নেই কোনো জাদুকরি সুর। শুধু তার ডাক শুনেই হাজারো পাখি ছুটে আসে। আর এই দৃশ্য যেন মানুষ ও নিরীহ প্রাণীর মধ্যে গড়ে ওঠা ভালোবাসা ও বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই পাখিপ্রেমীর নাম বুদ্ধ। পেশায় তিনি কাঁচামাল ব্যবসায়ী। প্রায় এক দশক ধরে প্রতিদিন পাখিদের খাবার দিয়ে আসছেন তিনি। ২০১৬ সালের দিকে ফলমূল, বিস্কুট ও চানাচুর দিয়ে কয়েকটি পাখিকে খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তার এই পথচলা। সময়ের সঙ্গে সেই অভ্যাসই পরিণত হয়েছে ভালোবাসা ও নেশায়।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে গ্রামের বাড়ির মসজিদ থেকে হেঁটে জামতৈল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন বুদ্ধ। আর তখনই শুরু হয় অন্যরকম এক দৃশ্য। তাকে অনুসরণ করে পাখির ঝাঁকও প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসে বাজারে। আড়তে পৌঁছানোর পর চানাচুরের জার হাতে নিয়ে পাখিদের খাবার দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।

বুদ্ধ বলেন, ‘কামারখন্দের মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে আসি। তখনই পাখিরা বের হয়। পাখিদের খাওয়াতে খাওয়াতে জামতৈল বাজারে নিয়ে আসি। বাজার থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব এক থেকে সোয়া এক কিলোমিটার।’

তিনি জানান, গত ১০ বছর ধরে নিয়মিত পাখিদের খাওয়াচ্ছেন। বাজারের সবচেয়ে ভালো চিকন চানাচুর কিনে পাখিদের খাওয়ান। এ কাজে তার কোনো ক্লান্তি নেই। যতদিন আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন পাখিদের খাবার দিয়ে যেতে চান তিনি। পরিবারের সদস্যরাও তার এ কাজে সম্মতি দেন।

বুদ্ধ আরও বলেন, ‘আমি ডাকলেই কামারখন্দ হাটখোলা থেকে জামতৈল বাজার পর্যন্ত হাজার হাজার পাখি খাওয়ার জন্য চলে আসে। শুরুতে অল্প অল্প করে ফল, বিস্কুট ও চানাচুর দিতাম। পাখিরা সেগুলো খেত। এরপর নিয়মিত খাওয়ানো শুরু করি। এভাবেই ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে।’

তার এই ভালোবাসা শুধু স্বচ্ছল সময়েই সীমাবদ্ধ নয়। বুদ্ধ জানান, গত ১০ বছরে কখনো অভাব, কখনো অসুস্থতার মধ্যেও পাখিদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন। এমনকি বাড়ি থেকে নিজের জন্য আনা খাবারও পাখিদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। কিছু পাখি আবার বিকেল পর্যন্ত তার আশপাশে অবস্থান করে।

বুদ্ধের ভাষায়, যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এভাবেই পাখিদের খাবার দিতে চান তিনি।

জামতৈল বাজারের ব্যবসায়ী গোলাম হোসেন বলেন, ‘এটা একটি ভালো উদ্যোগ। আল্লাহ ওনার মাধ্যমে পাখিদের রিজিকের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। এই কাজ সবাই করে না। শুধু পাখি নয়, যেকোনো প্রাণীকে খাবার দেওয়া ভালো কাজ, সওয়াবের কাজ।’

প্রতিদিনের ব্যস্ত বাজার, মানুষের কোলাহল আর ব্যবসার হিসাবের মাঝেও বুদ্ধের এই ছোট্ট উদ্যোগ যেন অন্যরকম এক দৃশ্য তৈরি করেছে। তার ডাক শুনে যখন আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি নেমে আসে, তখন সেখানে শুধু খাবার দেওয়ার ঘটনা থাকে না, দেখা যায় দীর্ঘদিনের এক বিশ্বাসের সম্পর্ক। মানুষের ভালোবাসা যে বন্য ও নিরীহ প্রাণীর মনেও জায়গা করে নিতে পারে, বুদ্ধ ও পাখিদের এই সম্পর্ক তারই জীবন্ত উদাহরণ।

সূত্র: কালবেলা

আরও পড়ুন

ডাইনোসর বিলুপ্ত, তবু টিকে গেল কুমির: রহস্য উন্মোচন

পৃথিবী থেকে একসময় হারিয়ে গেছে বিশালাকার ডাইনোসর। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

ফুটপাতের পিঠা-পুরির দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়, কার্যকর ১ নভেম্বর থেকে

সড়কের পাশে পিঠা, পুরি, ঝালমুড়ি ও পেঁয়াজু বিক্রির দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকে নিবন্ধন...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী: কাকেরা কি চলে গেছে, নাকি হারিয়েছি আমরাই?

একসময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে কিংবা বাড়ির পাশের ডাস্টবিনে দেখা মিলত তাদের। গ্রীষ্মের অলস দুপুরেও জানালার বাইরে থেকে...
জাতীয়
0
minutes

শেষ ইচ্ছা ছিল বীজ বাঁচানো, ৬০ প্রজাতির ধানে বেঁচে থাকবেন রামেট্টন

কেরলের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামন নিজের জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণে। অর্থনৈতিক কষ্ট, ব্যক্তিগত ত্যাগ কিংবা...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img