গাজীপুরের সাফারি পার্ক থেকে গভীর রাতে চুরি হয়েছিল তিনটি বিপন্ন রিংটেইল লেমুর। সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হওয়া সেই প্রাণীগুলোর মধ্যে দুটির সন্ধান মিলেছে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে ভারতের গুজরাটে।
কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভারতে পাওয়া প্রাণী দুটি কী সত্যিই গাজীপুর থেকে চুরি হওয়া সেই লেমুর?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন ডিএনএ পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং ইন্টারপোলের সহযোগিতার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ।
গভীর রাতের চুরি
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ গভীর রাতে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পার্কের নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতর থেকেই পাচারকারীরা সহযোগিতা পেয়েছিল।
চুরির পর প্রাণীগুলো প্রথমে একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয়। এরপর তাদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে পাঠানো হয় ভারতের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে।
একটি বন্য প্রাণী চুরি, তারপর ছবি তুলে বিদেশি ক্রেতার কাছে পাঠানো, ঘটনার এই ধারাবাহিকতা তদন্তকারীদের সামনে একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের চিত্র তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত
তদন্ত অনুযায়ী, তিনটি লেমুরের মধ্যে দুটি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। সীমান্ত পার হওয়ার পর প্রাণী দুটি আরেক পাচারকারীর হাতে যায়, তারপর আরও কয়েকটি হাত ঘুরে পৌঁছে যায় গুজরাটের জামনগরে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই যাত্রাপথে লেমুর দুটির দামও কয়েক দফা বদলেছে।
বাংলাদেশে বিক্রির জন্য যেখানে লাখ টাকায় দর কষাকষি হয়েছিল, সেখানে শেষ পর্যন্ত প্রাণী দুটি প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি হওয়ার তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
বনতারা থেকে মিলল সূত্র
ভারতের গুজরাটে অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ উদ্যোগ ‘বনতারা’-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে লেমুর দুটি থাকার তথ্য সামনে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি থেকে।
ছবি দেখেই বাংলাদেশের তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, এগুলো কি গাজীপুর থেকে চুরি হওয়া সেই প্রাণী?
এরপর শুরু হয় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
কিন্তু এখানেই সামনে আসে আরেক ভয়াবহ বাস্তবতা।
চেনার কোনো বৈজ্ঞানিক পরিচয় নেই
সাফারি পার্কে বছরের পর বছর থাকার পরও লেমুরগুলোর শরীরে কোনো মাইক্রোচিপ বসানো হয়নি।
ছিল না কোনো স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর।
সংরক্ষণ করা হয়নি ডিএনএ প্রোফাইলও।
ফলে এখন শুধু ছবি দেখে প্রাণী দুটিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিকভাবে মালিকানা দাবি করতে প্রয়োজন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
এই একটি ঘাটতি এখন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পুরো প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে।
শেষ ভরসা ডিএনএ
বর্তমানে গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকা একটি শাবক লেমুরের ডিএনএ সংগ্রহ করে ভারতে থাকা দুটি প্রাণীর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে।
যদি প্রমাণ হয় যে তারা একই পরিবারের সদস্য, তাহলে চুরি হওয়া লেমুরগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হবে।
২০১৮ সালে শুরু হয়েছিল গল্পটি
লেমুরগুলোর বাংলাদেশে আসার ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়।
২০১৮ সালে বিরল পাখি ও প্রাণীর একটি অবৈধ চালান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়ে। অভিযোগ ছিল, পাখি হিসেবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অন্যান্য বিরল প্রাণীর সঙ্গে দুটি লেমুরও দেশে আনা হয়েছিল।
পরে জব্দ হওয়া প্রাণীগুলোর একটি অংশ গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
সেই জোড়া লেমুরের দুটি শাবক জন্ম নেয়। পরে বাবা লেমুরটির মৃত্যু হলে মা ও দুটি শাবকসহ তিনটি লেমুর পার্কে ছিল।
এরপর ২০২৫ সালের সেই রাত।
আর তারপর শুরু হয়, গাজীপুর থেকে সীমান্ত, সীমান্ত থেকে ভারত, আর ভারত থেকে গুজরাটের দীর্ঘ পাচারযাত্রা।
একটি চুরি, নাকি বড় আন্তর্জাতিক চক্র?
মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়েছে। ছয়জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি এখন শুধু তিনটি লেমুর চুরির ঘটনা নয়।
এটি সামনে এনেছে- সাফারি পার্কের নিরাপত্তার দুর্বলতা; সীমান্ত দিয়ে বন্য প্রাণী পাচারের ঝুঁকি; আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের উপস্থিতি এবং সংরক্ষিত প্রাণীদের বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার বড় ঘাটতি।
এখন প্রশ্ন একটাই, গুজরাটে থাকা লেমুর দুটি কি সত্যিই গাজীপুরের সেই চুরি হওয়া প্রাণী?
উত্তর মিলতে পারে ডিএনএ পরীক্ষায়।
আর যদি পরিচয় নিশ্চিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় শুরু হতে পারে তাদের বাংলাদেশে ফেরার পথ।






