কানাডার মেরিনল্যান্ড সামুদ্রিক পার্কের অগভীর পানিতে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন তত্ত্বাবধায়কেরা। তাঁদের কাছে একে একে এগিয়ে যাচ্ছিল বেলুগা তিমি টোফিনো। তাঁরা আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন তার গায়ে। কিছুক্ষণ পর ক্রেন দিয়ে দেড় হাজার কেজির বেশি ওজনের তিমিটিকে তুলে নেওয়া হলো একটি ট্রাকে। কানাডা থেকে তার নতুন ঠিকানা যুক্তরাষ্ট্রের সি-ওয়ার্ল্ড সান আন্তোনিও।
টোফিনোর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কাছে অবস্থিত বন্ধ হয়ে যাওয়া মেরিনল্যান্ড থেকে ৩০টি বেলুগা তিমি ও চারটি ডলফিন সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। বন্দিদশা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগকে অনেকেই প্রাণীগুলোর জন্য নতুন জীবনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু স্থানান্তরের পর একাধিক প্রাণীর মৃত্যু সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বন্দিদশা থেকে বাঁচানোর অভিযান
মেরিনল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে বন্দি থাকা তিমি ও ডলফিনগুলোর জন্য নতুন আবাস খুঁজতে হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে। প্রাণীকল্যাণ নিয়ে উদ্বেগের কারণে কানাডার সরকার চীনে তিমিগুলো বিক্রির পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বিকল্প ব্যবস্থা না হলে প্রাণীগুলোকে কষ্ট না দিয়ে মেরে ফেলার কথাও বিবেচনা করতে হতে পারে।
এ ঘোষণার পর কয়েকটি অ্যাকোয়ারিয়াম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রাণীগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর ফলে বন্দি তিমিদের স্থানান্তরের অন্যতম বৃহৎ অভিযান সম্পন্ন হয়। তিমি ও ডলফিনগুলোকে বিমান ও অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, আটলান্টা, সান ডিয়েগো ও সান আন্তোনিও এবং স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় নেওয়া হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়া ক্যামেরায় ধারণ করেন আলোকচিত্রী কার্লোস ওসোরিও। ড্রোনে ধারণ করা দৃশ্যে টোফিনোকে তত্ত্বাবধায়কদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে দেখা যায়।
ওসোরিওর কাছে ঘটনাটি ছিল ঐতিহাসিক। কানাডায় বন্দি অবস্থায় থাকা শেষ তিমিটি নতুন ঠিকানায় চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটির সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী বন্দি রাখার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
“এটাই শেষবার ঘটেছে এবং এমনটা আর কখনো ঘটবে না,” বলেন তিনি।
স্থানান্তরের পরও ছয় প্রাণীর মৃত্যু
উদ্ধার অভিযান সত্ত্বেও পাঁচটি বেলুগা তিমি ও একটি ডলফিন মারা গেছে। এতে স্থানান্তরের উদ্দেশ্য, প্রাণীগুলোর শারীরিক অবস্থা এবং নতুন পরিবেশে তাদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিকাগোর শেড অ্যাকোয়ারিয়ামে মারা যায় মেরিনল্যান্ড থেকে আনা পিকাচু (২৩), রেইন (২০), ওসিরিস (২৬) ও কাস্পিয়ান (২৭)। এ ছাড়া অ্যাকোয়ারিয়ামটির দীর্ঘদিনের বাসিন্দা বিথোভেনও (৩৪) মারা যায়। ওই গ্রীষ্মে মেরিনল্যান্ড থেকে আটটি বেলুগা তিমি সেখানে নেওয়া হয়েছিল।
ময়নাতদন্তে পিকাচু ও রেইনের পরিপাকতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের পেটে পালক, বড় পাথর ও রঙের মতো দেখতে ছোপসহ বিভিন্ন অস্বাভাবিক বস্তু পাওয়া গেছে। শেড অ্যাকোয়ারিয়ামের ধারণা, শিকাগোয় স্থানান্তরের আগেই তিমি দুটি এসব বস্তু খেয়েছিল।
ওসিরিসের প্রাথমিক পরীক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী যকৃতের রোগ শনাক্ত হয়।
স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার ওশেনোগ্রাফিক অ্যাকোয়ারিয়ামও জেলি বিন নামের একটি বেলুগা তিমি ও ইকো নামের একটি ডলফিনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে। অ্যাকোয়ারিয়ামটির ভাষ্য অনুযায়ী, ডলফিনটি গুরুতর দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা নিয়ে সেখানে পৌঁছেছিল। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তার গিলতে ও শ্বাস নিতে অসুবিধা শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানান্তর অভিযান সফল হয়েছে কি না, তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা কঠিন। প্রাণীগুলোর পূর্ববর্তী স্বাস্থ্যগত অবস্থা, দীর্ঘদিনের বন্দিদশা এবং পরিবহনের ধকল, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
কানাডিয়ান প্রেসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে মেরিনল্যান্ডে প্রায় ২০টি তিমি মারা যায়।
বদলে গেছে তিমি বন্দি রাখার বিষয়ে জনমত
একসময় কানাডার অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ছিল মেরিনল্যান্ড। তবে দীর্ঘদিনের মালিকের মৃত্যুর পর প্রাণীকল্যাণ নিয়ে উদ্বেগ ও আর্থিক সংকটের মধ্যে ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৬১ সালে চালু হওয়া এই পার্কের ইতিহাসের পাশাপাশি বদলে গেছে তিমিদের বন্দি রাখার বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। কানাডা তিমিজাতীয় প্রাণীর বন্দিত্ব ও প্রজনন নিষিদ্ধ করেছে। ফ্রান্স ও মেক্সিকোসহ আরও কয়েকটি দেশেও এ ধরনের চর্চা নিষিদ্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশন কানাডার মুখপাত্র মেলিসা ম্যাটলো বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি সিটাসিয়ান বা তিমি, ডলফিন ও শুশুকজাতীয় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী বন্দি অবস্থায় রয়েছে।
তাঁর মতে, বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা অনেক প্রাণীর পক্ষে বন্য পরিবেশে ফিরে গিয়ে টিকে থাকা কঠিন। ফলে তাদের জন্য বিকল্প আবাস তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
ম্যাটলো বলেন, এতে প্রাণীকল্যাণের সংকট ক্রমেই বাড়ছে। তবে মেরিনল্যান্ডের প্রাণীগুলোকে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও তাঁর সংস্থার উদ্বেগ ছিল। তাঁর বক্তব্য, কোনো প্রাণী পরিবহনের ধকল সহ্য করার মতো সুস্থ না হলে তাকে স্থানান্তর করা উচিত নয়।
অক্টোবরের শুরুতে শেড অ্যাকোয়ারিয়াম জানিয়েছিল, মেরিনল্যান্ড থেকে আসা কয়েকটি বেলুগার গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তবে অ্যাকোয়ারিয়ামটির ভাষ্য অনুযায়ী, জীবিত থাকা বেলুগাগুলোর মধ্যে ইতিবাচক লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ।
সমুদ্রের কাছাকাছি অভয়ারণ্যের প্রস্তাব
মেরিনল্যান্ডের অবশিষ্ট বন্দি তিমি ও ডলফিনের জন্য বিকল্প আবাস হিসেবে দুটি প্রস্তাব দিয়েছে ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশন কানাডা। প্রথমটি হলো, মেরিনল্যান্ডের স্থাপনাটিকে প্রাণীদের জন্য বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে রূপান্তর করা। দ্বিতীয়টি হলো, নোভা স্কটিয়ায় প্রস্তাবিত ‘হোয়েল স্যাংচুয়ারি প্রজেক্ট’ বা তিমির অভয়ারণ্য প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুবিজ্ঞানী লরি মারিনোর মতে, বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা প্রাণীগুলোকে সরাসরি বন্য পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না হলে তাদের জন্য সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত অভয়ারণ্য তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে তারা তুলনামূলক প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবে।
মারিনোর আশা, এই অভয়ারণ্যে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২ থেকে ১৫টি তিমিকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটির জন্য আরও তহবিল প্রয়োজন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ৬০ লাখ কানাডীয় ডলার সংগ্রহ করতে হবে।
একই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আইসল্যান্ডেও কাজ চলছে। সেখানে বেলুগা তিমির জন্য উপকূলীয় আবাস তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনীয় কাজ বাকি থাকায় জুলাই মাসে দুটি তিমির স্থানান্তর পরবর্তী গ্রীষ্ম পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সেন্টার ফর হোয়েল রিসার্চের গবেষণা পরিচালক মাইকেল ওয়াইস বলেন, এ ধরনের অভয়ারণ্যের ধারণা এখনো অনেকটাই পরিকল্পনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। তবে তাঁর মতে, কংক্রিটের ট্যাংকের তুলনায় উপকূলীয় অভয়ারণ্য প্রাণীদের কল্যাণ উন্নত করতে পারে।
আহত বন্য তিমির পুনর্বাসন কিংবা ধরা পড়া অর্কাকে বন্য পরিবেশে ফেরানোর প্রস্তুতিতে অতীতেও অস্থায়ী জালঘেরা জলাশয় ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বন্দিদশায় দীর্ঘদিন কাটানো তিমিদের স্থায়ীভাবে অভয়ারণ্যে রাখার কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।
বন্দিদশা শেষ হলেও বিতর্ক রয়ে গেছে
কানাডায় তিমি বন্দি রাখা নিষিদ্ধ হলেও যেসব দেশে প্রাণীগুলোকে পাঠানো হয়েছে, সেখানে একই ধরনের বিধিনিষেধ নেই। সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছু তিমির প্রজনন ঘটানো হলে বন্দিদশার চক্র দীর্ঘায়িত হতে পারে।
তবে জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়ামের প্রাণীকল্যাণ বিভাগের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক জেসন জোন্সের মতে, প্রজনন প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনের অংশ। তাই প্রাণীগুলোর সুস্থতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেই সুযোগকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়ামে মেরিনল্যান্ড থেকে ব্যালর (১০) ও জেফির (৭) নামের দুটি পুরুষ বেলুগা তিমিকে নেওয়া হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই থাকা চারটি স্ত্রী তিমির সঙ্গে তাদের রাখা হয়েছে।
জোন্স জানান, নতুন পরিবেশে পৌঁছানোর পর তিমি দুটি সতেজ, সতর্ক ও সাড়াদানকারী ছিল। তারা খাবার গ্রহণ করেছে, নতুন আবাস ঘুরে দেখেছে এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। তাঁর মতে, এগুলো ছিল ইতিবাচক লক্ষণ।
মেরিনল্যান্ডের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ফিল ডেমার্সের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধ হয়ে যাওয়া একই সঙ্গে স্বস্তি ও বেদনার। তিনি আশা করেন, কানাডার নিষেধাজ্ঞা অন্য দেশগুলোকেও তিমি বন্দি রাখার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করবে। তবে তাঁর মতে, পার্ক বন্ধ হওয়া মানেই তিমিদের বন্দিদশার অবসান নয়; আপাতত তাদের আবাসস্থল বদলেছে মাত্র।
তিমি দেখার আগ্রহীদের জন্য তাঁর পরামর্শ, কৃত্রিম জলাধারে তিমির কসরত দেখার বদলে বন্য পরিবেশে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা কিংবা প্রকৃতিবিষয়ক তথ্যচিত্র দেখা।
“ট্যাংকের মধ্যে তিনবার পেছন দিকে ডিগবাজি দেওয়ার চেয়ে আমি বন্য পরিবেশে একটি তিমিকে ঘুরে বেড়াতে দেখতে বেশি পছন্দ করব,” বলেন ডেমার্স।
মেরিনল্যান্ডের তিমিদের স্থানান্তর তাই শুধু একটি পার্ক থেকে অন্য পার্কে প্রাণী সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা নয়। এটি বন্দি প্রাণীদের ভবিষ্যৎ, তাদের কল্যাণ এবং মানুষের বিনোদনের জন্য বন্যপ্রাণীকে আটকে রাখার নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবারও সুযোগ তৈরি করেছে।
সূত্র: বিবিসি






