সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ শিকার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জেলেদের একটি চক্র পরিচালনার অভিযোগে শাহরিয়ার সুমনকে আটক করেছে মোংলা থানার পুলিশ।
সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী বাজার এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। স্থানীয়দের কাছে সুমন নিজেকে যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে জানা গেছে। তবে তার কোনো সাংগঠনিক পদ নেই বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় সুমনকে আটক করা হয়েছে। তার আটকের পর সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করে আসছে। সম্প্রতি এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে।
এর আগে শনিবার দুপুরে মোংলা উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের গোড়াবুড়বুড়িয়া এলাকায় সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের একটি খাল থেকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরে ফেরার সময় স্থানীয় গ্রামবাসী প্রায় ২০০ কেজি মাছ ও একটি নৌকাসহ দুই জেলেকে আটক করেন। পরে প্রভাবশালী একটি মহলের হুমকি-ধমকিতে তাদের মাছ ও নৌকাসহ ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
আটক দুই জেলে হলেন সুন্দরবন ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুহিদুল হাওলাদার এবং মোংলার চিলা ইউনিয়নের বাসিন্দা নাঈম শেখ। স্থানীয়দের ধারণ করা একটি ভিডিওতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই দুই জেলে দাবি করেন, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তারা সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরেছেন এবং শাহরিয়ার সুমনের নির্দেশেই তারা সুন্দরবনে গিয়েছিলেন।
তবে জেলেদের এই বক্তব্য অস্বীকার করেন শাহরিয়ার সুমন। ঘটনার পর তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, সুন্দরবনে মাছ ধরার জন্য তিনি কাউকে পাঠাননি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর শাহরিয়ার সুমন সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের জন্য প্রায় ৫০টি নৌকায় ২০০ জনের বেশি জেলেকে সংগঠিত করেন। এসব জেলে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে নিয়মিত বিষ প্রয়োগ করে মাছ আহরণ করতেন বলেও অভিযোগ তাদের।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, চক্রটির কোনো জেলে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে আটক হলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়া হতো। এ সময় বিএনপির নাম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে বন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এদিকে শনিবার গ্রামবাসীর হাতে আটক হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া প্রায় ২০০ কেজি মাছ ও নৌকাটি এখনো পুলিশ বা বন বিভাগের জব্দে আসেনি বলে জানা গেছে। ফলে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত মাছ ও নৌকাটি উদ্ধার ও জব্দ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, মাছ ও নৌকাটি জব্দ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্তের আওতায় আনা গেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ওই দুই জেলেকে কারা ছাড়িয়ে নিয়েছিল এবং তাদের ওপর কারা প্রভাব বা চাপ প্রয়োগ করেছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি তদন্তে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার একটি ভিডিও ফুটেজ তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছেন। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখার জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহরিয়ার সুমনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের মামলায় শাহরিয়ার সুমনকে আটক করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তাকে আদালতে পাঠানো হবে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
সূত্র: সংবাদটি ১ সেপ্টেম্বর দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত






