পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন বনে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা মিললেও এবার প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের একটি সংরক্ষিত বনে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে বিরল মেঘলা চিতা (Clouded Leopard)। কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে ১৩ মাস ধরে পরিচালিত গবেষণায় ক্যামেরা ট্র্যাপে এই বিপন্ন বন্যপ্রাণীর ছবি পাওয়া গেছে।
এ গবেষণার ফল চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইনানী জাতীয় উদ্যানে শুধু মেঘলা চিতাই নয়, আরও ২১ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এশীয় হাতি, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, লজ্জাবতী বানর, শজারু, মায়া হরিণ, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, গন্ধগোকুল, বিভিন্ন প্রজাতির কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী।
তিন ক্যামেরায় মিলল পাঁচ ছবি
২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় ১৫টি ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে ৩২টি স্থান পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, ইনানী জাতীয় উদ্যানের আয়তন প্রায় ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। গবেষণায় স্থাপন করা ক্যামেরাগুলোর মধ্যে তিনটিতে মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পায়ের ছাপ ও মল পরীক্ষার মাধ্যমেও বনে এ প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেখানে জলাশয়, পাহাড়ি ছড়া ও পানির প্রবাহ রয়েছে, সেসব এলাকায় বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।
মেঘলা চিতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মেঘলা চিতা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলের একটি মাঝারি আকারের বন্যপ্রাণী। শরীরে মেঘের মতো বড় বড় ছোপ থাকায় এর নাম হয়েছে মেঘলা চিতা।
এরা বেশির ভাগ সময় গাছের ওপর কাটায় এবং বানর, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে। গাছে ওঠানামায় এদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। পায়ের গোড়ালির সন্ধি অত্যন্ত নমনীয় হওয়ায় মেঘলা চিতা গাছের খাড়া কাণ্ড বেয়ে মাথা নিচের দিকে রেখেও নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশে প্রাণীটি মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বৈশ্বিকভাবে আইইউসিএনের লাল তালিকায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ (Vulnerable) শ্রেণিতে রয়েছে।
বন দখল ও মানুষের চাপ বড় হুমকি
গবেষকদের মতে, ইনানী জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতার উপস্থিতি প্রমাণ করে, ব্যাপক মানবচাপের মধ্যেও কক্সবাজারের কিছু বনাঞ্চলে এখনো সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে।
তবে এই বন এখন নানা ধরনের হুমকির মুখে। মানুষের বসতি সম্প্রসারণ, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বিস্তার, বন উজাড়, জ্বালানি সংগ্রহ, কৃষিজমির জন্য অবৈধ দখলসহ নানা কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের চলাচল বেশি এমন এলাকা এবং কৃষিনির্ভর অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম।
প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বন মেঘলা চিতার উপযোগী
গবেষণায় ইনানী জাতীয় উদ্যানের প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বনাঞ্চলকে মেঘলা চিতার বসবাসের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘন গাছপালা ও ঝোপঝাড়সমৃদ্ধ এলাকায় এদের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। এমন বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর।
বন্যপ্রাণী গবেষক রেজা খানের মতে, ইনানীতে মেঘলা চিতার উপস্থিতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, মেঘলা চিতার আবাসস্থল চিহ্নিত করে বিশেষভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বনে কাঠ আহরণ বন্ধ এবং প্রয়োজন হলে বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল থেকে মানব বসতি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একসময় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বনাঞ্চল অনেক বেশি সংযুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব বন খণ্ডিত হয়েছে। মেঘলা চিতা গাছনির্ভর শিকারি প্রাণী হওয়ায় বন খণ্ডিত হয়ে যাওয়া তাদের জন্য বড় ধরনের হুমকি। ইনানীতে এ প্রাণীর উপস্থিতি তাই পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে রক্ষা করা যাবে ইনানীর জীববৈচিত্র্য?
গবেষকেরা ইনানী জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বনভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও দখল বন্ধ করা, পাহাড়ি ছড়া ও খাল রক্ষা করা এবং বন্যপ্রাণীর পানির উৎসগুলো সচল রাখা।
পাশাপাশি জাতীয় উদ্যানের চারপাশে উপযুক্ত বাফার জোন তৈরি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে রাঙামাটি থেকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া একটি মেঘলা চিতাও বর্তমানে কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে রয়েছে।
ইনানীর বনে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া মেঘলা চিতার ছবি তাই শুধু একটি বিরল প্রাণীর সন্ধান নয়; এটি কক্সবাজারের বনাঞ্চলে এখনো টিকে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রেরও প্রমাণ। তবে সেই বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা না গেলে মেঘলা চিতাসহ বহু বিরল প্রাণী ভবিষ্যতে এই বন থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো






