প্রকৃতিকে আমরা জয় করতে চাই। নদীকে বেঁধে ফেলি, পাহাড় কেটে ফেলি, বন উজাড় করি, জলাভূমি ভরাট করি, বাতাসে বিষ ছড়াই। তারপর যখন প্রকৃতি তার স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন আমরা তাকে বলি ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকৃতির এই দুর্যোগ কি সত্যিই শুধু প্রকৃতির?
মানুষ প্রকৃতির বাইরে কোনো আলাদা সত্তা নয়। মানুষ নিজেই প্রকৃতির একটি অংশ। আমাদের খাবার, পানি, অক্সিজেন, বাসস্থান, সবকিছুর মূল উৎস প্রকৃতি। অথচ সভ্যতার নামে, উন্নয়নের নামে এবং নিজেদের সুবিধার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত সেই প্রকৃতির ওপর আঘাত করছি। বন ধ্বংস করছি, নদী দখল করছি, মাটি ও পানি দূষিত করছি। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি।
প্রকৃতি অবশ্যই প্রতিশোধ নেয় না; প্রকৃতি প্রতিক্রিয়া দেখায়
বন উজাড় হলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে। জলাভূমি ভরাট হলে অতিরিক্ত পানি ধারণের জায়গা কমে যায়। নদী দখল ও দূষিত হলে তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়লে পৃথিবীর তাপমাত্রা ও জলবায়ুর স্বাভাবিক ধরন বদলে যায়। আর এসব পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব মানুষের জীবনেই ফিরে আসে- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল, লবণাক্ততা কিংবা সুপেয় পানির সংকটের মতো নানা বিপদের মাধ্যমে।
আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হচ্ছে। কোথাও নদীর পানি বাড়ছে, কোথাও জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। দুর্যোগের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ড যে এসব ঝুঁকিকে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বনভূমি ধ্বংস
একটি সুস্থ পরিবেশের জন্য বনভূমি শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি প্রকৃতির একটি নিরাপত্তাবলয়। বন ঝড়ের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে, মাটি ধরে রাখে, পানি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে, কার্বন শোষণ করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। অথচ মানুষের লোভ ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে সেই বনই প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে।
একটি গাছ কেটে ফেলা মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি পাখির বাসা, একটি প্রাণীর আশ্রয়, মাটির একটি সুরক্ষা, একটি ক্ষুদ্র প্রতিবেশব্যবস্থা। হাজার হাজার গাছ হারালে তার প্রভাব আর স্থানীয় থাকে না; তা পুরো পরিবেশব্যবস্থার ওপর পড়ে।
বায়ুদূষণের চিত্রও ভয়াবহ। শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণ বাতাসকে মানুষের জন্য অনিরাপদ করে তুলছে। দূষিত বায়ু শ্বাসতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
পানিও নিরাপদ নয়। নদী-খাল ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা, শিল্পদূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ আমরা শুধু মানুষের জন্য নয়, পুরো জীবজগতের জন্যই একটি বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি করছি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ঝুঁকি। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশের জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষি ও জীবিকার ওপর চাপ, সবকিছুই ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধান শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মধ্যে নেই। সমাধান হলো প্রকৃতিকে দেখার আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা।
একদিকে নতুন গাছ লাগাতে হবে, অন্যদিকে পুরোনো বন রক্ষা করতে হবে। নদী দখলমুক্ত করতে হবে, জলাশয় রক্ষা করতে হবে, শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শহর পরিকল্পনায় জলাধার ও সবুজ এলাকা নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, সেই উন্নয়নের সংজ্ঞা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। কোনো একক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন কিংবা পরিবেশবাদী দলেরও নয়। এই দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
কারণ আমরা প্রকৃতির মালিক নই। আমরা প্রকৃতির অংশ।
সৃষ্টিকর্তার দেওয়া প্রকৃতি আমাদের জন্য শুধু ভোগের সম্পদ নয়; এটি আমাদের বেঁচে থাকার ভিত্তি। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণ নৈতিক দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক দায়িত্ব।
আজ আমরা যদি নদী দখল করি, বন কাটি, পাহাড় ধ্বংস করি, বাতাসে বিষ ছড়াই, তাহলে তার মূল্য শুধু আমাদের প্রজন্মকেই দিতে হবে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও সেই মূল্য দেবে।
সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
নিজে সচেতন হই। অন্যকে সচেতন করি। প্রকৃতির ওপর আগ্রাসন বন্ধ করি।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ-
প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আমরা কোথায় যাব?
প্রকৃতিকে বাঁচান। প্রকৃতির সঙ্গে বাঁচুন। কারণ প্রকৃতি বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে।






