মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের উদ্ভিদসমাজ, বাড়ছে কাঁকড়া গাছ

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে এক দশকের ব্যবধানে বীজ থেকে চারা জন্মানোর হার কমেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ে গড়ে ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ বীজ নষ্ট হয়েছে। তবে বেঁচে থাকা চারাগাছ অনুকূল পরিবেশে দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে সুন্দরী ও গেওয়া গাছের বিস্তারে পরিবর্তনের পাশাপাশি চাঁদপাই রেঞ্জের নির্দিষ্ট এলাকায় কাঁকড়া গাছের বিস্তার বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়।

গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের উদ্ভিদের পুনর্জন্ম ও বিস্তারের ক্ষেত্রে লবণাক্ততা, মিঠাপানির প্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিষয় ভূমিকা রাখছে। তবে একটি নির্দিষ্ট এলাকার গাছপালার পরিবর্তন দিয়ে পুরো সুন্দরবনের পরিস্থিতি বিচার করা যাবে না।

এক দশকে নষ্ট হয়েছে ৫২.৮৯ শতাংশ বীজ

‘ইকোলজিক্যাল ইনফ্লুয়েন্সেস অন রিজেনারেশন ডাইনামিকস ইন দ্য সুন্দরবন, বাংলাদেশ: এক্সপ্লোরিং বায়োটিক অ্যান্ড অ্যাবায়েটিক ফ্যাক্টরস অ্যাক্রোস টাইম অ্যান্ড স্পেস’ শিরোনামের গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের একদল গবেষক। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের বীজ ও চারাগাছের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এ সময়ে সুন্দরবনে গড়ে ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ বীজ নষ্ট হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বীজ নষ্ট হওয়ার হার ছিল ৪০ শতাংশ।

লবণাক্ততার মাত্রাভেদেও বীজ নষ্ট হওয়ার হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। গত এক দশকে কম লবণাক্ত এলাকায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বীজ নষ্ট হয়েছে। মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় এ হার ৩৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং বেশি লবণাক্ত এলাকায় ৮২ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

তবে বীজ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চারাগাছের বৃদ্ধির চিত্রও গবেষণায় উঠে এসেছে। সেখানে চারাগাছের বৃদ্ধি ২৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ হারে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় সুন্দরবনের ১০টি উদ্ভিদ পরিবারের ১৪ প্রজাতির বীজ থেকে জন্মানো চারা, সাতটি পরিবারের ১০ প্রজাতির ছোটগাছ এবং আটটি পরিবারের ১০ প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষ নিয়ে কাজ করা হয়।

প্রজাতিভেদে বীজ নষ্ট হওয়ার হারেও পার্থক্য রয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গরানের ২২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সুন্দরীর ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ, কাঁকড়া গাছের ৪ দশমিক ১২ শতাংশ এবং গেওয়া গাছের ১ দশমিক ৯ শতাংশ বীজ নষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে চারাগাছের বৃদ্ধি কম লবণাক্ত এলাকায় ৩০১ দশমিক ১ শতাংশ, মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় ৯৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং তীব্র লবণাক্ত এলাকায় ২৩২ শতাংশ হয়েছে।

সুন্দরবনে কম লবণাক্ত অঞ্চল বলতে প্রতি হাজারে ৫ থেকে ১৫ ভাগ, মাঝারি লবণাক্ত অঞ্চল বলতে ১৫ থেকে ২৫ ভাগ এবং তীব্র লবণাক্ত অঞ্চল বলতে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ লবণাক্ততাকে বোঝানো হয়েছে।

লবণাক্ততার সঙ্গে বদলাচ্ছে গাছের বিস্তার

সুন্দরবনের উদ্ভিদের পুনর্জন্ম পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বীজ থেকে চারা, চারা থেকে ছোটগাছ এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ণবয়স্ক গাছে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়।

খুলনায় বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, “…সুন্দরবন এটা কন্টিনিউয়াস মনিটরিং এর মধ্যে থাকছে, নানা ধরনের জরিপ হচ্ছে। আমাদের ৫৫টি পার্মানেন্ট স্যাম্পল প্লটগুলো দিয়ে সুন্দরবনের হেলথটাকে এসেস (পরিস্থিতি মূল্যায়ন) করি। কী পরিমাণ রি-জেনারেশন থাকছে; কমছে-বাড়ছে এই জিনিসগুলো।”

তিনি বলেন, “পার্মানেন্ট স্যাম্পল প্লটে কী পরিমাণ বীজ পাওয়া যাচ্ছে (সিডলিং), চারা কী পরিমাণ হচ্ছে (স্যাপলিং), চারা কী পরিমাণ টিকছে এবং সেখান থেকে আবার অ্যাডাল্ট গাছ কী পরিমাণ হচ্ছে এবং সুন্দরবনে কিছু হঠাৎ করে চেঞ্জ আসছে কি না, পরিবর্তন হচ্ছে কি না- এই জিনিসগুলো দেখা হয়।

“সুন্দরবনে লবণ সহিষ্ণু অঞ্চলে গরান-গেওয়া এখন বেশি পাওয়া যাচ্ছে, মৃদু লবণাক্ত অঞ্চলগুলোতে সুন্দরীটা বেশি পাওয়া যাচ্ছে এখনো। আর পুরো সুন্দরবনে গেওয়া গাছটা একটু বেড়ে গেছে, মোটামুটি সব অঞ্চলেই।”

তবে সুন্দরী গাছের জায়গা পুরোপুরি কাঁকড়া গাছ দখল করে নিয়েছে, এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন এই গবেষক। তাঁর মতে, সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে গাছের বিস্তারের ধরন আলাদা।

মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, মাঝারি লবণ এলাকায় বিশেষ করে ঢাংমারি, খুলনা রেঞ্জের জায়গাগুলোয় মোটামুটি (কাঁকড়া গাছ) পাওয়া যায়। এর দুইটা প্রজাতি আছে একটা হচ্ছে কাঁকড়া, আরেকটা লাল কাঁকড়া। হয়ত এই অঞ্চলটাতে মোটামুটি বেশি পাওয়া যায়। সার্বিকভাবে সুন্দরী কমে গেছে, সুন্দরীর জায়গাটা কাঁকড়া নিয়ে নিয়েছে, বিষয়টা এরকম নয়।

তিনি আরও বলেন, “ওভারঅল সুন্দরবনে কাঁকড়া তেমন বাড়েনি। গেওয়া ও গরান বেড়েছে। এখনো কিন্তু সুন্দরবনে সুন্দরী গাছ পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা হচ্ছে লেস স্যালাইন (কম লবণাক্ত) জোনে। স্ট্রং স্যালাইনিটি এলাকায় এখন গরানের প্রভাব বেশি। আর ওভারঅল সব জায়গাতে গেওয়া বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে কম লবণাক্ত অঞ্চল যেগুলো, সেখানে এখনো সুন্দরীটাই মেইন ডমিনেটিং স্পিসিস বলা হয়।”

সুন্দরবনের উদ্ভিদ প্রজাতির এ পরিবর্তনকে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা। তবে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রভাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

মমিনুল ইসলাম নাহিদ বলেন, “ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম স্বাভাবিকভাবে একটা পরিবর্তনের মধ্যে যাবেই। একটা প্রজাতি সবসময় থাকবে বিষয়টা এরকম না। জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, ফ্রেশ ওয়াটার সুন্দরবনে কম আসছে। ফারাক্কা ড্যামের পরে আমাদের সাত অঞ্চলের নদীগুলো, সুন্দরবনের যে নদীগুলো আছে মিষ্টি পানি আসতে পারছে না।”

তিনি আরও বলেন, মিঠাপানি না এলে লবণপানি ওপরের দিকে উঠে আসে। এতে লবণসহিষ্ণু গাছগুলো অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বিস্তার লাভ করে। অন্যদিকে মিঠাপানি বা কম লবণাক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রজাতিগুলো প্রতিকূলতার মুখে পড়ে।

তাঁর ভাষায়, “যেই গাছগুলো মিষ্টি পানি বা কম লবণে থাকছে বা মাঝারি লবণে থাকতে পারে, তারা এখন একটু সাফার করতেছে ওই জায়গাগুলোতে, যখন ডমিনেটিং যেগুলো আছে সেগুলো জায়গা করে নিচ্ছে।”

তবে বীজ ও চারাগাছের মৃত্যুর বিষয়টিকে পুরোপুরি অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না এই গবেষক। তাঁর মতে, বীজ থেকে চারা, চারা থেকে পূর্ণবয়স্ক গাছে পরিণত হওয়ার প্রতিটি ধাপেই কিছু গাছ মারা যায়। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সুন্দরবনের উদ্ভিদসমাজ টিকে থাকে।

চাঁদপাই রেঞ্জে কমেছে সুন্দরী-গেওয়ার আধিপত্য

সুন্দরবনের গাছের প্রজাতিগত বিস্তারের পরিবর্তন নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে গত আগস্টে। ‘ডিটেকশন অব কাঁকড়া ট্রি এক্সপ্যানশন ইন দ্য নর্দান সুন্দরবনস’ শিরোনামের এ গবেষণায় স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে চাঁদপাই রেঞ্জের উদ্ভিদ বিস্তারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে চাঁদপাই রেঞ্জের যে এলাকায় সুন্দরী ও গেওয়া গাছের বিস্তার ছিল ১৭ হাজার ৩২ হেক্টর, ২০২২ সালে তা কমে ১২ হাজার ২২ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে ১৯৮৮ সালে কাঁকড়া গাছের প্রাধান্য ছিল ১২১ হেক্টর এলাকায়। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ১৬ হেক্টর।

গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জে সুন্দরী-গেওয়া গাছের আধিপত্য ৬২ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে ৪৩ দশমিক ৯৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে বেশি ঘনত্বে কাঁকড়া গাছের বিস্তার শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ হয়েছে।

এ ছাড়া মাঝারি ঘনত্বে কাঁকড়া গাছের বিস্তার ৫৩৯ হেক্টর থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৪১৮ হেক্টরে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে বিস্তারের হার ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এ চিত্র পুরো সুন্দরবনের নয়; এটি চাঁদপাই রেঞ্জের নির্দিষ্ট একটি এলাকার পরিস্থিতি।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের সদস্য (প্রযুক্তি) মো. মাহমুদুর রহমান। গবেষক দলে ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শামীম রেজা সাইমুম, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. কামরুজ্জামান, মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের জিয়াউল ইসলাম এবং জার্মানির ড্রেসডেন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির এলমার চাপলোভিচ।

মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, “এটা কিন্তু সব জায়গায় নয়, এটা সুন্দরবনের একটা লোকালাইজড অংশের চিত্র। সুন্দরবন তো অনেক বড় প্রায় ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এটার মধ্যে ছোট একটা অংশেই (চাঁদপাই রেঞ্জ ২৭২ বর্গ কিলোমিটিার) এ ঘটনা। পুরো সুন্দরবনে এটা রিপ্রেজেন্ট করবে না। পুরো সুন্দরবনে এখনো এরকম দেখা যাচ্ছে না। শুধু ওই জায়গাটা নির্বাচন করেছি, যেখানে কাঁকড়া গাছ বেশি দেখা যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, কাঁকড়া গাছের বিস্তার বেড়েছে। আগে কাঁকড়া গাছ একটি ছোট এলাকায় ছিল। কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, এটি এখন একটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

ক্যাপশন: কাঁকড়া গাছ

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “এখন সুন্দরবনের মধ্যে যে ন্যাচারাল ইকোসিস্টেম আছে, ওভাবে চালু রাখতে পারলেই বেশি ভালো। আগের মত পানি প্রবাহ রাখা, মানুষের ওভাবে ডাইরেক্ট করার কিছু নেই। ফ্রেশ ওয়াটার উজান থেকে যদি পানি না আসে বা ভিন্ন কারণে; মনিটর করা যেতে পারে। এখানে আসলে পরিবর্তন ফেরানোটা যে খুব সহজ হবে না।”

গবেষণার সহগবেষক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও কাঠবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “কাঁকড়া স্পিসিস তুলনামূলক বাড়ছে। রিমোট সেন্সিং ডেটাগুলো বলছে এ স্পিসেস সংখ্যাটা বেড়েছে। সুন্দরী তো অনেক আগের থেকেই কমছে। আগামরা রোগ আছে। সুন্দরীটা কমার অনেকগুলা কারণ; এই গাছটার আসলে গ্রোথটা ঠিক মত হয় না, আনসুইটেবল কন্ডিশন হয়েছে।”

তাঁর মতে, সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ নব্বইয়ের দশক থেকেই চলমান। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ছত্রাকের আক্রমণ ও অনুপযুক্ত পরিবেশের মতো বিষয় এ গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। সুন্দরী গাছ দুর্বল হয়ে পড়লে অন্য প্রজাতির গাছ সেখানে বিস্তারের সুযোগ পায়।

অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “এইটা নির্দেশ করে যে এই আবাসস্থলটা তার জন্য আসলে উপযুক্ত না। অনেকগুলা কারণের মধ্যে হয়ত রয়েছে, “টাইডাল ফ্লো (জোয়ার ভাটার গতি) কমে গেছে অথবা স্যালাইনিটি (লবণাক্ততা) বেড়ে গেছে অথবা অন্য কোনো ইস্যু আছে। কোনো প্রিভেনশন মেজার (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা) তো নিচ্ছি না। ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে আগামারা গাছগুলো কাটার উদ্যোগ হয়েছিল। আগামারা গাছগুলো কাটার সাথে সাথে ভালো গাছও কাটা পড়েছে।”

সুন্দরী গাছ রক্ষায় নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সুন্দরীকে বাঁচানোর জন্য নতুন করে ‘রিপ্লান্টিং’ অথবা ‘রিস্টোর’ করার বিষয়ে পুনরায় গবেষণা করে কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে, এ উদ্যোগ হতে পারে।”

নব্বইয়ের দশকে চারাগাছ টিকে থাকার হার ছিল ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা টিকে থাকা ও বৃদ্ধির চিত্র নিয়ে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় তথ্য পাওয়া যায়। ‘সার্ভাইভাল অ্যান্ড গ্রোথ পারফরম্যান্স অব সাম ম্যানগ্রোভ স্পিসিস প্লান্টেড ইন দ্য সুন্দরবনস অব বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণায় দেখা যায়, বীজ থেকে জন্মানো চারার বেঁচে থাকার হার ছিল ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ। গড়ে ৬০ শতাংশ প্রজাতির চারা বেঁচে ছিল।

গবেষণায় মাঝারি ও অতিরিক্ত লবণাক্ত এলাকার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ প্রজাতি- গেওয়া, গরান, সুন্দরী, কাঁকড়া, পশুর ও বাইন, পর্যবেক্ষণ করা হয়।

মাঝারি লবণাক্ত এলাকায় বেড়া দিয়ে তৈরি বাগানে গেওয়া গাছের চারা টিকে থাকার হার ছিল ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ, গরানের ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ, সুন্দরীর ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ, কাঁকড়ার ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ, পশুরের ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বাইন গাছের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

গবেষণায় এসব প্রজাতির উচ্চতা বৃদ্ধির হারও পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরীক্ষামূলক বাগানে পাঁচ বছর বয়সে গাছগুলোর বেঁচে থাকা ও প্রাথমিক বৃদ্ধি মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সুন্দরবনের ফাঁকা এবং প্রাকৃতিকভাবে যেখানে চারা কম, সেখানে বাগান তৈরির মাধ্যমে বনের উন্নয়ন ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করাই ছিল গবেষণাটির উদ্দেশ্য।

তবে উন্মুক্ত স্থানের বাগানে হরিণের বিচরণের কারণে চারাগাছের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় বাধা দেখা যায়। গবেষণায় বলা হয়, হরিণের খাওয়ার ফলে গেওয়া ও গরান ছাড়া অন্য চারটি প্রজাতির সব চারাই মারা যায়।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের খুলনার ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের মো. ফয়েজউদ্দীন, এম এম রহমান, এম শহীদুল্লাহ, এএসএম হেলাল সিদ্দিকী, এম হাসনাইন ও এম এইচ রশিদ এ গবেষণা করেন।

মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বাড়ছে লবণাক্ততার প্রভাব

সুন্দরবনের পরিবেশগত পরিবর্তনের পেছনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজানে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবনে স্যালাইনিটি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটাকে বলে ‘স্লো আনসেট প্রসেস’ (ধীর গতির প্রক্রিয়া)। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, স্যালাইনিটি বাড়ছে। আবার মানুষ সৃষ্ট প্রসেসও এর মধ্যে আছে। সেটা হল ‘আপস্ট্রিমে ফ্লো উথড্র’ (উজানে পানি সরিয়ে নেওয়া) করছে বিভিন্ন ব্যারেজ-ড্যাম দিয়ে, আমরাও বিভিন্নভাবে নদীর পথে বিঘ্ন করছি। নদীর তলদেশ ভরে গেছে।”

তিনি বলেন, “ফ্রেশ ওয়াটার ফ্লো কম আসছে। আর এদিকে বরফ গলছে, হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এই যে ইন্টারেকশন ফ্রেশ ওয়াটার অ্যান্ড সল্ট ওয়াটার- এখানে দেখা যাচ্ছে পরাজিত হচ্ছে ফ্রেশ ওয়াটার, স্যালাইন ওয়াটার উপরের দিকে গেছে।”

সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা এক রকম নয়। কিছু এলাকায় লবণাক্ত পানি বেশি, আবার কিছু এলাকায় মিঠাপানির প্রভাব রয়েছে। পরিবেশের এ ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটলে সব প্রজাতির গাছ সমানভাবে টিকে থাকতে পারে না।

অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবনের যে বৈশিষ্ট্য তাতে কিছু ফরেস্ট আছে স্যালাইন আর বেশ কিছু ফরেস্ট আছে যেগুলোতে নন স্যালাইন ওয়াটার আছে। এই জন্য ওখানে একটা ডাইনামিক চেঞ্জ হবে। ফরেস্ট ইকোসিস্টেমে যেগুলো ‘টলারেন্ট’ করতে পারে না। একটা লেভেলের বেশি তারা মরে যাবে, তখন দেখা যাবে ওই জায়গায় ‘টলারেন্ট’ গুলো আবার বাড়ছে। ফরেস্ট ইকোসিস্টেম নিজেই সে তার কাউন্টার ব্যালেন্স করবে।

“ফ্রেশ ওয়াটার ফ্লো কমে আসছে, ফলে যেসব প্রজাতি ফ্রেশ ওয়াটারে বাড়ত, এগুলো কিন্তু ধীরে ধীরে মরে যাবে। তেলবাহী জাহাজ, কয়লা ভর্তি জাহাজ ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনা রয়েছে। মানুষের নানা ধরনের হস্তক্ষেপে এসব কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হচ্ছে বেশি।”

সুন্দরবনের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে: প্রতিমন্ত্রী

সুন্দরবনের গাছপালার পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে দেখছেন না পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তাঁর দাবি, সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এখন নতুন করে গাছের সক্ষমতা বাড়ছে।

তিনি বলেন, “অনেক কিছুতে এখন কিন্তু সহনীয় ক্ষমতা বেড়ে গেছে, যেটা আগে ছিল না। এটা তো প্রাকৃতিকভাবে হয়। কারণ প্রাকৃতিকভাবে বনটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে এখানে বনের জন্য হার্মফুল যেগুলো, মনুষ্যসৃষ্ট যে দুর্যোগ, ‘রেড টাইপ ইন্ডাস্ট্রি’ (পরিবেশের জন্য বেশি ক্ষতিকর) যদি করা হয় বা জাহাজডুবির যে ঘটনাগুলো ঘটে—এগুলো বনের ক্ষতি হয়।

“তেলবাহী জাহাজ ডুবিতে বায়োডাইভার্সিটি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ সেখানে এগুলো নিতে পারে না। প্রাকৃতিকভাবে যে দুর্যোগগুলো আসছে, সুন্দরবনের সেটাকে নিজস্বভাবে, প্রাকৃতিকভাবে কাটিয়ে ওঠার তার সক্ষমতা রয়েছে।”

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম মনে করেন, সুন্দরবনের উদ্ভিদকূলের পুনর্জন্ম নিয়ে উদ্বেগের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তাঁর ভাষ্য, একসময় সমুদ্র থেকে লবণপানি এবং উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহের সংমিশ্রণে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কম লবণাক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিছু উদ্ভিদ প্রজাতির বিস্তার কমেছে।

তিনি বলেন, “কিন্তু দেখা গেছে যে, উপর থেকে মিষ্টি পানি আসা বন্ধ হওয়ার কারণে লেস স্যালাইন ওয়াটারের যে প্ল্যান্টগুলো ছিল, সেগুলোর সংখ্যা অনেক কমে গেছিল। তো এখন আবার দেখা যাচ্ছে যে, কিছু কিছু আবার নতুন করে জারমিনেশন (চারা জন্মানো) হচ্ছে। এখন এটা কতদিন টিকবে, কী হবে সেটা এখন বলা যাচ্ছে না।”

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “আগামরা বা ‘টপ ডাইং ডিজিজ’ এর কারণে কিছু বড় গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ছোট গাছের যে বৃদ্ধি এবং যে পরিধি, সেটা বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহ আগে একটা সেমিনার হয়েছিল বন অধিদপ্তরে, সেটায় দেখলাম। এ সেমিনারে অনেক অধ্যাপক, গবেষকরাও ছিলেন।”

সুন্দরবন নিয়ে পুরোনো গবেষণার তথ্যের পাশাপাশি নতুন তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আশির দশকের তথ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। সুন্দরবন ঘিরে নতুন করে জেগে ওঠা চর ও বিস্তৃত এলাকার ওপর আরও গবেষণা প্রয়োজন।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, “ইকোলজিক্যাল যে ব্যালেন্সটা সেটা তো নষ্ট হয়ে গেছে, এটা তো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নাই। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, লবণপানি উঠছে, কিন্তু উপর থেকে মিষ্টি পানি আসছে না, যার জন্য এই যে ইকোলজিক্যাল যে ব্যালেন্সটা, এটা টোটালি হ্যাম্পার হচ্ছে।

“আবার যদি আমরা এই পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প চালু করতে পারি, তাহলে সুন্দরবনে আবার মিষ্টিপানির প্রবাহ কিন্তু কিছুটা হলেও বৃদ্ধি করতে পারব।”

সুন্দরবনের গাছপালার পরিবর্তন নিয়ে গবেষণাগুলোতে একদিকে বীজ নষ্ট হওয়ার হার, অন্যদিকে চারাগাছের বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট এলাকায় প্রজাতির বিস্তারের পরিবর্তন উঠে এসেছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, সুন্দরবনের উদ্ভিদসমাজে পরিবর্তন ঘটছে। তবে পরিবর্তনের প্রকৃতি ও বিস্তার নির্ধারণে পুরো বনজুড়ে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, মিঠাপানির প্রবাহের তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

আরও পড়ুন

নিরাপত্তা বোধ করায় শাবকদের নিয়ে ধানখেতে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম হাতির পালের

সাধারণত কৃষিজমির মাঝখানে একসঙ্গে অনেক হাতিকে শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় না। তবে ভারতের আসাম রাজ্যের সবুজ ধানখেতের মাঝে কাদামাটির একটি জায়গায় এশীয় হাতির...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

পরিবেশ রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি উদ্যোগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

পরিবেশ ও বন রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও উদ্যোগী হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

PFAS-এর দূষণ: প্রকৃতির বুকে মানুষের তৈরি দীর্ঘস্থায়ী বিপদ

আধুনিক জীবনকে সহজ করতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কৃত্রিম রাসায়নিক। এর মধ্যে কিছু রাসায়নিক পরিবেশে সহজে ভাঙে না, বছরের পর বছর টিকে থাকে এবং পানি,...
দূষণ ও দখল
0
minutes

কুয়াকাটায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শতবর্ষী বটবৃক্ষকে সংরক্ষিত ঘোষণা

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় শত বছরের বেশি বয়সী একটি বটবৃক্ষকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও রাখাইন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img