বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে স্বীকৃত রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে সাকার মাছের বিচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হাওর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস। গত শুক্রবার পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমিতে বাস্তুতন্ত্রের সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত ‘জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার’ বিষয়ক মতবিনিময়সভায় এ উদ্বেগ জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশসচিব ড. ফাহমিদা খানম। হাওরের প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো রামসার এলাকায় সাকার মাছের উপস্থিতি উদ্বেগের কারণ। দ্রুত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে দেশি মাছের গুরুত্বপূর্ণ এই আশ্রয়স্থল রক্ষার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগ্রাসী সাকার মাছ হাওরের দেশি মিঠাপানির মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। শুধু টাঙ্গুয়ার হাওর নয়, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরেও জেলেদের জালে নিয়মিত ধরা পড়ছে এই মাছ।
জেলেদের জালে বারবার সাকার
গত ১১ জুলাই দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের উত্তরচান্দপুর গ্রামের চাপতির হাওরে মাছ ধরার সময় এক জেলের জালে সাকার মাছ ধরা পড়ে। ১৬ জুলাই ছাতকের হলদিউড়া গ্রামের শরিফ উদ্দিনের জালেও একটি সাকার মাছ ধরা পড়ে। এরপর এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি আরও দুটি সাকার মাছ ধরেন।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর সুনামগঞ্জের অন্যতম বড় হাওর, দেখার হাওরের বড়দই বিলের কাছে বারোঘর জলাশয়ে মৎস্যজীবী খাইরুল ইসলাম ও আব্দুস সোবহানের জালে সাকার মাছ ধরা পড়ে।
মৎস্যজীবী খাইরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন হাওরে মাছ ধরলেও এর আগে এমন মাছ তিনি দেখেননি। মাছটি কয়েক ঘণ্টা শুকনা জায়গায় রাখার পরও সেটির স্বাভাবিক নড়াচড়া ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এই মাছ ভবিষ্যতে হাওরের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বংশবিস্তার নিয়ে উদ্বেগ
মৎস্যজীবী, পরিবেশবিদ ও হাওর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, ঘন ঘন জেলেদের জালে সাকার মাছ ধরা পড়লেও এর বিস্তার ঠেকানো বা সাকারমুক্ত হাওর গড়ে তোলার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
তাঁদের আশঙ্কা, সাকার মাছের সংখ্যা বাড়তে থাকলে দেশি মাছের পাশাপাশি জলজ কীটপতঙ্গ ও সামগ্রিক জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, শুধু সাকার মাছ নয়, সব আগ্রাসী ও এলিয়েন প্রজাতিই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আশির দশকে অ্যাকোয়ারিয়াম পরিষ্কারের কাজে ব্যবহারের জন্য ব্রাজিল থেকে সাকার মাছ আনা হয়েছিল। পরে অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে এটি বুড়িগঙ্গা হয়ে দেশের বিভিন্ন নদী, বিল ও হাওরে ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালে সাকার মাছ নিষিদ্ধ করা হলেও এটি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং হচ্ছে না। টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো রামসার এলাকায় এর বিস্তারকে তিনি হাওরের জন্য বিপদবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
সুনামগঞ্জের মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরিফুল হক আকন্দ বলেন, হাওরে সাকার মাছ ধরা পড়ার খবর তাঁরা প্রায়ই পাচ্ছেন। জেলেদের এ মাছের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। তবে এর বংশবিস্তার ঠেকাতে এখনই সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল মনসুর বলেন, সাকার মাছ প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং বছরে একাধিকবার বংশবিস্তার করতে সক্ষম। হাওরে এর উপস্থিতি বাড়তে থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তাঁর পরামর্শ, জেলেদের জালে সাকার মাছ ধরা পড়লে সেটি যেন আবার পানিতে ছেড়ে দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হাওর থেকে এই মাছ অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
রামসার স্বীকৃত টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে সাকার মাছের বিস্তার এখন শুধু একটি নতুন মাছের উপস্থিতির ঘটনা নয়; এটি দেশি মাছ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার বিষয়।
সূত্র: কালের কণ্ঠ






