ঘন জঙ্গলের অন্ধকারে হঠাৎ যদি চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি বিশাল বাঘ, আর তার শরীরের কমলা-হলুদ রং প্রায় ঢেকে থাকে কালো ডোরায়, তাহলে দৃশ্যটি যে কাউকে চমকে দিতে পারে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেন একটি বিশাল কালো ছায়া এগিয়ে আসছে।
এটি কোনো লোককথা বা কল্পকাহিনি নয়। ভারতের ওড়িশার সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভে সত্যিই এমন বিরল বাঘের দেখা মেলে। তবে এদের সরাসরি ‘কালো বাঘ’ বলা পুরোপুরি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বিজ্ঞানীরা এদের বলেন pseudo-melanistic tiger অর্থাৎ ছদ্ম-মেলানিস্টিক বাঘ।
কেন এত কালো দেখতে?
সাধারণ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের শরীরে কালো ডোরাগুলি তুলনামূলকভাবে সরু এবং পরস্পর থেকে আলাদা থাকে। কিন্তু সিমলিপালের এই বিশেষ বাঘগুলির ক্ষেত্রে কালো ডোরাগুলি অস্বাভাবিকভাবে চওড়া হয়ে যায় এবং অনেক জায়গায় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
ফলে শরীরের কমলা রঙের অংশ অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায়। দূর থেকে তখন বাঘটিকে প্রায় সম্পূর্ণ কালো বলেই মনে হয়।
গবেষণায় এই অস্বাভাবিক ডোরার সঙ্গে Taqpep জিনের একটি নির্দিষ্ট জেনেটিক পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এটি কোনো নতুন প্রজাতি নয়, এরা আসলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারই।

সিমলিপালেই কেন এত বেশি?
এখানেই লুকিয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় রহস্য।
সিমলিপালের বাঘের জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে অন্যান্য বাঘের আবাসস্থল থেকে তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন। ফলে অন্য বাঘের জনসংখ্যার সঙ্গে তাদের জিনের আদান-প্রদান সীমিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, ছোট ও বিচ্ছিন্ন এই বাঘের জনসংখ্যায় genetic drift বা জিনগত পরিবর্তনের দৈব প্রভাবের কারণে বিরল pseudo-melanistic বৈশিষ্ট্যটি তুলনামূলকভাবে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষণায় সিমলিপালকেই বন্য পরিবেশে এই বৈশিষ্ট্যের একমাত্র নিশ্চিত জনসংখ্যা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।
২০২২ সালে ১৬টির মধ্যে ১০টিই ছিল ‘কালো’ বাঘ
ভারতের ২০২২ সালের সর্বভারতীয় বাঘ গণনায় সিমলিপালে ১৬টি বাঘ নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টিকে melanistic বা pseudo-melanistic হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে পরবর্তী বছরগুলিতে সিমলিপালের বাঘের সংখ্যা বেড়েছে।
২০২৬ সালের সর্বশেষ ক্যামেরা-ট্র্যাপ সমীক্ষায় ৩৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি pseudo-melanistic বাঘ। পাশাপাশি ১৬টি শাবকেরও সন্ধান পাওয়া গেছে।
একই ফ্রেমে চার ‘কালো’ বাঘ!
২০২৬ সালের জুনে সিমলিপাল থেকে প্রকাশিত এক বিরল ক্যামেরা-ট্র্যাপ ছবিতে জ়িনাত (Zeenat) নামে মহারাষ্ট্রের তাডোবা-আন্ধারি টাইগার রিজার্ভ থেকে আনা একটি বাঘিনীকে চারটি শাবকের সঙ্গে দেখা যায়। ঘটনাটি সিমলিপালের বাঘ সংরক্ষণ ও জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি, সব শাবককে ‘কালো বাঘ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এমন দাবি করা ঠিক নয়। সিমলিপালের বিরল বৈশিষ্ট্যটির বৈজ্ঞানিক নাম pseudo-melanism।
‘World’s Rarest Black Tiger’ কতটা সঠিক?
‘World’s Rarest Black Tiger’ কথাটি সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে ‘pseudo-melanistic Bengal tiger’ বলা বেশি নির্ভুল।
কারণ এদের শরীরে কালো রঞ্জক সম্পূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়ে না; বরং অস্বাভাবিকভাবে চওড়া ও মিশে যাওয়া কালো ডোরাগুলিই বাঘটিকে কালো দেখায়।
বিরল সৌন্দর্যের আড়ালেও রয়েছে সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
সিমলিপালের এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য যেমন প্রকৃতির এক বিস্ময়, তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণগত প্রশ্ন। ছোট ও বিচ্ছিন্ন বাঘের জনসংখ্যায় জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সিমলিপালে অন্য বাঘের জনসংখ্যা থেকে বাঘ এনে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্রের তাডোবা-আন্ধারি থেকে আনা বাঘিনী জ়িনাতের চার শাবকের জন্ম সেই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিমলিপালের গভীর জঙ্গলে তাই আজও ঘুরে বেড়ায় এমন কিছু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, যাদের শরীরের কালো ডোরাগুলি সাধারণ বাঘের তুলনায় এতটাই বিস্তৃত যে দূর থেকে তাদের প্রায় কালো বলে মনে হয়।
এরা কোনো কাল্পনিক ‘কালো বাঘ’ নয়, প্রকৃতির জিনগত বৈচিত্র্যের এক বিরল ও বাস্তব উদাহরণ।






